বুধবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রাক টার্মিনালের নামে খাল দখলের পাঁয়তারা

track standব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রাক স্ট্যান্ডের নামে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাল ভরাট করছে ট্রাক মালিক সমিতি। শহরের মেড্ডা এলাকায় জেলার প্রাচীন শিল্প-প্রতিষ্ঠান কোকিল টেক্সটাইল মিলের সামনের এ খালের কয়েক কোটি টাকার জায়গা ইতিমধ্যেই দখল করে ফেলা হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে নদীতে মেশিন বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে বালু দিয়ে চলছে এই খাল ভরাট ও দখল প্রক্রিয়া। মেড্ডা এলাকার পানি নিষ্কানের অন্যতম এই খালটি ভরাট করে ফেলার কারণে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিবেশ দূষণের আশংকাও করা হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ দফায় দফায় মৌখিক ও পরে লিখিত নোটিশ করার পরও ভরাট কাজ বন্ধ না করায় এবার মামলা করা হয়েছে। জানা যায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সরাইল-মাধবপুর সড়কের ৩য় কিমি. ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেরুড়া মৌজার পূর্ব মেড্ডা এলাকায় জেলার প্রাচীন শিল্প-প্রতিষ্ঠান কোকিল টেক্সটাইল মিলের অবস্থান। এই প্রতিষ্ঠানটিতে এলাকার বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ শ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ মিলে সুতা উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করা হয়। মিলের সামনে সড়ক ও জনপথের মালিকানাধীন একটি খাল রয়েছে। এ খাল দিয়ে মেড্ডা ও শহরের বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশিত হয়ে থাকে। এমনকি এই খালের পানি ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি-নির্বাপক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গত কয়েক মাস ধরে ট্রাক মালিক সমিতি খালটি ভরাট করে জায়গা দখলের পাঁয়তারা করতে থাকলে ১২ মার্চ কোকিল টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হোসেন বেপারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর এক আবেদন করে দখল থেকে খালটি রক্ষা করে পরিবেশ বাঁচানোর আহ্বান জানান। আবেদনে জানান হয়, খালটি ভরাট করে দখল করা হলে এলাকার পরিবেশ নষ্ট এবং মিলে কর্মরত নারী-পুরুষদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। আবেদনে আরও বলা হয়, খাল ভরাট বন্ধ করে মিলের নামে জায়গাটি লিজ দিলে মৎস্য চাষ ও বনায়নের ব্যবস্থা করে পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হবে। এদিকে গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি ট্রাক মালিক সমিতি ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে তিতাস নদী থেকে বালু এনে সড়ক ও জনপথের খালটি ভরাট শুরু করে। সড়ক ও জনপথের জেলা অফিসের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার ট্রাক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে মৌখিকভাবে খাল ভরাট বন্ধ করে ড্রেজার সরানোর অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ট্রাক মালিক সমিতি সওজের অনুরোধ তোয়াক্কা না করে খাল ভরাট ও জায়গা দখল অব্যাহত রাখে। এ অবস্থায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ বিষয়টি সদর থানা পুলিশকে জানায় এবং সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঞা ২২ মার্চ জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদককে একটি চিঠি দিয়ে ড্রেজার সরিয়ে খাল ভরাট বন্ধ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাতেও তারা কর্ণপাত করেনি। এ অবস্থায় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকুল চন্দ্র বিশ্বাস ট্রাক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে অবৈধভাবে খাল ভরাট বন্ধ করে ২৫ মার্চ সকাল ১০টায় সদর থানায় উপস্থিত হয়ে বক্তব্য পেশ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথের চিঠি, সদর থানা পুলিশের লিখিত নির্দেশ কিছুতেই কাজ হয়নি। সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ট্রাক মালিক সমিতি জোরজবরদস্তি করে, অবৈধ উপায়ে সড়ক ও জনপথের সাড়ে ১৮ শতাংশ মহামূল্যবান জায়গা বালু ভরাট করে দখলে নিয়ে নেয়। এ জায়গার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ২৫ মার্চ সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ভূঞা সদর থানায় ট্রাক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু এতকিছুর পরও ট্রাক মালিক সমিতি খাল ভরাট বন্ধ করে ড্রেজার সরিয়ে নেয়নি। অবশেষে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকসহ সদস্যদের আসামি করে ২৯ মার্চ সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। সোমবার ঘটনাস্থল সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কোকিল টেক্সটাইল মিলের সামনের রাস্তায় পাইপ বসানো রয়েছে। ট্রাক মালিক গ্রুপের লোকজন বেড়া দিয়ে একটি বড় জায়গা বালু ভরাট করে দখল করে রেখেছে। তিতাস নদীতে ড্রেজারও রয়েছে যথারীতি। সড়কের উপর পাইপ দেয়ায় যান চলাচলের অসুবিধার সৃষ্টি হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার ভট্টাচার্য জানান, বারবার মৌখিক, লিখিত অনুরোধ করা সত্ত্বেও ট্রাক মালিক সমিতি জোর করে অবৈধভাবে সড়ক ও জনপথের কয়েক কোটি টাকার জায়গা দখল করে নিয়েছে। এ অবৈধ কাজের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক আমরা সরকারি জায়গা উদ্ধারের জন্য যা যা করণীয় সবই করব। ইতিমধ্যে থানায় মামলা দেয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। এ ব্যাপারে ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান তানিম খাল ভরাট করার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা ৫০ বছর ধরে পৌরসভাকে টার্মিনাল ট্যাক্স দিয়ে আসছি অথচ আমাদের কোনো ট্রাক টার্মিনাল নেই। ট্রাক মালিক সমিতির পক্ষে ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে ট্রাক টার্মিনালের জন্য ৫০ শতাংশ জায়গা ইজারা পাওয়ার আবেদন করা হয়। এরপর ৯ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভায় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে প্রস্তাব ও ২০১৩ সালের ৪ জুনের আঞ্চলিক পরিবহন সভায় সড়ক ও জনপথের উল্লেখিত জায়গায় ট্রাক টার্মিনাল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ১০ ডিসেম্বরে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় পৌর মেয়রের প্রস্তাবে উল্লিখিত জায়গায় ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায়ও ট্রাক টর্মিনাল স্থাপনের জন্য সড়ক ও জনপথের জায়গাটি ট্রাক মালিক সমিতির নামে ইজারা নেয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়। এ নিয়ে জেলা প্রশাসক সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠিও দেন। আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি ও জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেকই আমরা সওজের জলাশয় ভরাট করে ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, অবৈধভাবে খাল ভরাটের ব্যাপারে মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

jugantor.com

Print Friendly, PDF & Email