g উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরের হাসপাতালে ৫দিনে ৬৩শিশুর মৃত্যু | AmaderBrahmanbaria.Com – আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া


বুধবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং ৩রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরের হাসপাতালে ৫দিনে ৬৩শিশুর মৃত্যু

AmaderBrahmanbaria.COM
আগস্ট ১৩, ২০১৭
news-image

---

জাপানি এনসেফালাইটিস অথবা অক্সিজেনের অভাব অথবা গাফিলতি ,মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিতর্ক আছে।কিন্তু মৃত্যু থেমে নেই। গত পাঁচ দিনে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে ‘‌বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজ’‌–এ ৬৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যারমধ্যে রয়েছে সদ্যজাতও।শিশু মৃত্যুর ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী মানবাধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী। একে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে নিন্দা করেছেন তিনি। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারই মৃত্যু হয়েছে ২৩ শিশুর। তাতেই টনক নড়ে। অক্সিজেন সিলিন্ডারে ঘাটতি নিয়ে হাজার প্রশ্ন উঠছে বটে। তবে এনসেফালাইটিস নিয়ে রাজ্য সরকারের উদাসীনতাও প্রশ্নের মুখে।মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।গাফিলতির অভিযোগে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধানকে সাসপেন্ড করেছে রাজ্য সরকার।তবে শিশুমৃত্যুর দায় স্বীকার করে আগে থাকতেই ইস্তফাপত্র লিখে রেখেছিলেন বলে দাবি করেছেন হাসপাতালের ওই প্রধান।নিজের বিধানসভা নির্বাচনী কেন্দ্র গোরখপুরে শিশুমৃত্যু নিয়ে রীতিমতো চাপে মুখ্যমন্ত্রী এদিন সকালেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থনাথ সিং এবং চিকিৎসাপাঠ্যের মন্ত্রী আশুতোষ ট্যান্ডনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। গোরখপুরে গিয়ে ঘটনা সরেজমিনে দেখে তাঁদেরকে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেন। আশুতোষ ট্যান্ডন বলেন, পুরো ঘটনায় তদারক করছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিদ্ধার্থনাথ সিং বিরোধীদের এনিয়ে রাজনীতি না করতে আবেদন করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও গোরখপুরের পরিস্থিতির ওপর নজর রেখেছেন বলে টুইট করে জানিয়েছে তাঁর দপ্তর। বলা হয়েছে, ‘‌গোরখপুরের পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। উত্তরপ্রদেশে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সচিব পরিস্থিতির তদারকি করছেন।’‌

এদিকে, বিআরডি হাসপাতালে যে কোম্পানি থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার আসত, সেই পুষ্পা গ্যাস এজেন্সিতে শনিবার অভিযান চালাল পুলিস। যদিও কোম্পানির এইচআর মিনু ওয়ালিয়া হাসপাতালে সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধের কথা অস্বীকার করে দাবি করেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহে ঘাটতির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁরা বারবার কোম্পানির তরফে হাসপাতালকে বকেয়া প্রায় ৬৮.‌৫ লক্ষ টাকার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কখনও সাড়া পাননি। তা সত্বেও তাঁরা কখনই সরবরাহ বন্ধ করেননি। কারণ এভাবে তা করা যায় না। প্রায় ২০০টি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছিল হাসপাতালে বলে দাবি করেছে সিলিন্ডার কোম্পানি।মশাবাহিত রোগের জেরে ১৯৭৮ সালে উত্তরপ্রদেশে প্রথমবার মহামারি দেখা দেয়। সেই থেকে প্রতিবছরই জাপানি এনসেফালাইটিসের প্রকোপ দেখা দেয় রাজ্যে। যার জেরে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এই ‘‌বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজ’‌–এই ২২৪ শিশুর মৃত্যু হয়। আর ওই হাসপাতালে ভর্তি এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৯২০। এ বছরই এখনও পর্যন্ত ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী, গত চার দশক ধরে উত্তরপ্রদেশে থাবা বসিয়েছে দু’‌ধরনের এনসেফালাইটিস। একটি হল জাপানি এনসেফালাইটিস এবং অপরটি অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোম। দু’‌টোই ভাইরাল সংক্রমণ। যার জেরে মানুষ কোমায় পর্যন্ত চলে যায়। যদি কোনওরকমে সুস্থও হয়ে ওঠে, সারা জীবন মানসিক এবং শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েই কাটাতে হয়। চূনান্ত অব্যবস্থার জেরে গোরখপুরই এনসেফালাইটিসের কেন্দ্রস্থল। সরকারি হিসেবে ১৯৭৮ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত, সেখানে ২৫,০০০–এরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটা ৫০,০০০–এরও বেশি। যারা হাসপাতালে পর্যন্ত পৌঁছনোর সুযোগ পায়নি।১৯৫৬ সালে মাদ্রাজেই প্রথম অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোমের প্রকোপ দেখা দেয়। অনেক সাধ্য সাধনার পর তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তার কয়েক বছর পর, ১৯৭৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে এনসেফালাইটিস। শুধুমাত্র বাঁকুড়া ও বর্ধমান মনিলিয়েই মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়ায়। এরপর ১৯৭৮–এ উত্তরপ্রদেশে থাবা বসায় এনসেফালাইটিস। তবে ২০০৫ সালের আগে সতর্কতা তৈরি হয়নি। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, সে বছর রাজ্যের মোট ৫,৭৩৭ শিশু আক্রান্ত হয়েছিল। যার মধ্যে ১৩৪৪ জনের মৃত্যু হয়। চীন থেকে ওষুধ এনে ২০০৭ সালে প্রথম এনসেফালাইটিসের টিকা চালু হয়। তাতে অবস্থার উন্নতি হয় বটে। তবে খোলা নর্দমা, নোংরা জলে নিমগ্ন রাস্তাঘাট, এবং উন্মুক্ত আবর্জনা ফেলার জায়গা— এসবের জেরে গোরখপুরের পরিস্থিতি বদলায়নি। পরিচ্ছন্নতার ছিটেফোঁটাও নেই। সেখানকার দরিদ্র বাসিন্দাদের কাছে উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছয়নি।

হাসপাতাল বলতে ওই একটিই, ‘‌বাবা রাঘব দাস মেডিক্যাল কলেজ।’ শুধু গোরখপুর নয়, গোণ্ডা, বাস্তি এমনকী নেপালের তরাই ও পূর্ব বিহারের বিভিন্ন জেলার মানুষও সেখানে চিকিৎসা করাতে আসেন।পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি প্রকল্প চালু করেছে কেন্দ্র সরকার। কিন্তু গোরখপুর বা গোণ্ডায় তার কোনও প্রভাব পড়েনি। ২০১৭ সালের স্বচ্ছ ভারত সমীক্ষায় গোণ্ডা দেশের সবথেকে অপরিচ্ছন্ন জেলা বলে চিহ্নিত হয়েছিল। সেখানকার ৮–১০ বছর বয়সী শিশুরাই সবথেকে বেশি আক্রান্ত হয়। গত বছর জুলাই মাসে গোরখপুরে এইমস হাসপাতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি ঘটাতে না পারলে খুব শিগগির সমস্যার সমাধান অসম্ভব।

‌হাসপাতাল থেকে গৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারই ২৩ জনের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে প্রিম্যাচিওর সদ্যজাত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৪। বুধবার হাসপাতালে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সেদিন ৯ জনের মৃত্যু হয়। সোমবারও তাই। মঙ্গল ও শুক্রবারে যথাক্রমে ১২ ও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে বলে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দেন হাসপাতালের জনা কয়েক কর্মী। তবে অক্সিজেনের অভাবে কোনও শিশুর মৃত্যু হয়নি বলে দাবি করেছেন গোরখপুরের জেলাশাসক রাজীব রাউতেলা। তাঁর দাবি, অক্সিজেন সরবরাহকারী আরও কয়েকটি সংস্থার কাছ থেকে জোগান জারি ছিল। সংক্রমণের কারণেই এতগুলি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গাফিলতির অভিযোগ স্বীকার করেছে রাজ্য প্রশাসনও । তবে বিরোধীরা রাজ্যের স্বাস্থ মন্ত্রী সিদ্ধার্থনাথ সিংয়ের ইস্তফার দাবি তুলেছেন।

শনিবার বাবা রাঘবদাস মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন কংগ্রেসের গুলাম নবি আজাদ ,রাজ্ বব্বর,প্রমোদ তেওয়ারি সহ অন্যান্যরা। গোটা ঘটনার জন্য রাজ্য সরকারকেই দুষেছেন তাঁরা।হাসপাতালের চিকিৎসক এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। এর আগে সকালেই কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী সন্তানহারা মা–বাবাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রদেশ নেতৃত্বকে শোকাহত পরিবারগুলির পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাজ্য সরকারকে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতেও আবেদন করেন তিনি। টুইটারে শোকপ্রকাশ করে রাহুল গান্ধী উত্তর প্রদেশের বিজেপিশাসিত সরকার ঘটনার দায় নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেন। বহুজন সমাজ পার্টি নেত্রী মায়বতীও একই অভিযোগ তুলেছেন। বলেছেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য রাজ্য বিজেপি সরকারের তীব্র নিন্দা করছি।’‌ হাসপাতালের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি তদন্তকারী দল গঠন করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। সমাজবাদী পার্টির প্রধান তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব শনিবার সাংবাদিক বৈঠকে অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করছে রাজ্য সরকার এবং জেলা প্রশাসন। তিনি বলেন, বিরোধীরা কোনও রাজনীতি করছে না, কিন্তু বিজেপির বলা কথা আর কাজের তফাত সবার সামনে এসেছে। এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করেছে সব কটি বিরোধী দল এবং প্রধানমন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করেছে কংগ্রেস।

এ জাতীয় আরও খবর