g সম্প্রীতির রথে জাগরণে আলোড়ন : গোপাকে খুব মনে পড়ে | AmaderBrahmanbaria.Com – আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া


মঙ্গলবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সম্প্রীতির রথে জাগরণে আলোড়ন : গোপাকে খুব মনে পড়ে

AmaderBrahmanbaria.COM
সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭
news-image

---

আল আমীন শাহীন : শৈশবের খেলার সাথী গোপাকে মনে পড়ছে খুব। তিতাসপাড়ে একই পাড়ায় থাকতাম আমরা। গোপা খুব ভোরে ফুলের ঝুড়ি নিয়ে বের হতো। ঝুড়িতে কুড়িয়ে তুলতো শিউলী ফুল শ্রীকৃষ্ণের পূজোর আসনে চড়ানোর জন্য। ভোরের আজানে জেগে উঠতো গোপা, পরে ভোর কীর্তনে বের হতো পথে। গোপার আহবানে ঘর থেকে বের হয়ে দুজনে শুনতাম পাড়ার বাড়িবাড়ি সঙ্গীতের রেওয়াজ- সুর আর গান, গোপা ঘরে ফেরার পথে আমার হাতে তুলে দিত বেশ কটা শিউলী আর কুলফি ফুল। হাড়িপাতি খেলার জন্য তা রেখে দিতাম। মিষ্টি হাসতো গোপা। একদিন সকালে উঠে শুনি গোপারা চলে গেছে,পরিবার সহ। দেশ সীমা আর কাঁটাতাঁর পেরিয়ে । কোথায় গেছে আছে তা জানতে পারিনি আজও। শরৎ এলেই গোপার মুখটা ভেসে উঠে কাশফুলের শুভ্রতায়। গোপা আমি শাহনাজ, নাজমা,মুন্নী, অনিমা, স্বরসতি পূরবী ,মাধুরী , চান্দা ছটি ছোটবেলা এক সঙ্গে কতো খেলা করেছি। শহরের কালাইশ্রীপাড়ার গুরুচরণ আখরায় হতো দূর্গাপূজা। তিতাস নদীতে গোসল করতে গিয়ে লিটন,স্বপন, দীপন অনুপ,নিতু, জয়জিৎ,মহিতোষ, নারু, জগদীশ, মিঠু, টিংকুদের সাথে ডুব সাঁতারে সাঁতারে কতবার যে তিতাস পাড় হয়েছি,তরণী সানসাইন লঞ্চের উপর থেকে লাফ দিয়ে মাঝ নদীতে ধরতে চেয়েছি হো মাছ। সেই লঞ্চ নেই এখন দেখা মিলেনা হো মাছের। নদীতে লাফালাফি দাপাদাপি করে ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম গুরুচরণ আখড়ায় মূর্তি কারিগরদের কারুকাজ, রংয়ের প্রলেপ। পূজোতে আখড়াটি সাজানো হতো বর্নাঢ্যভাবে, সন্ধা হলেই আমাদের গোপাল স্যার ধুপ্তি নিয়ে নাচতেন। নিজেও ধূপ্তি হাতে সাদা ধোঁয়ায় মিশে যেতাম। অনেকগুলো ধূপ্তী নিয়ে নাচতে পারতেন গোপাল স্যার। নবমী দশমীতে ডাক ঢোল কাশী মন্দিরা আর দূপ্তী নিয়ে নেচে গেয়ে মুখর থাকতাম আমরা। বিসর্জন পর্যন্ত থাকতো এ ধারা। দূর্গোপূজো এলেই গোপা সহ বন্ধুদের খুব মনে পড়ে। কালাইশ্রীপাড়ার জগৎবাড়ি, রায়বাড়ি, চৌধুরী বাড়ি, আখড়া বাড়ির পার্বন উৎসবের নানা প্রসাদ, ওপাড়ার মাসি পিসী বৌদিদের আদরমেশানো লাড়– মুড়কি নানা কিছুর স্বাদ, আর গোপাদের সাথে কাটানো সময়ের সম্প্রীতি ভুলতে পারিনা।

এবার পূজো উপলক্ষে আলোর পথে নামক সংগঠনের অনুষ্টানে গিয়ে দেখি প্রায় শতাধিক মাসী পিসী দিদি বৌদিদের উপস্থিতি। দূর্গো পূজা উপলক্ষে সংগঠনটি দরিদ্রদের মাঝে বস্ত্র খাবার বিতরণ করবে। হযরত আলী আর পুষ্পেন ভৌমিক এ সংগঠনের সংগঠক। হযরত আলীরা পুষ্পেনদের জন্য পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী সম্প্রীতির আয়োজন, ঈদ এলে সামাজিক সংগঠনগুলো দরিদ্রদের জন্য আয়োজন করে এবার হলো পূজো উপলক্ষে, সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে সম্প্রীতির এই অনুষ্ঠানটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মনে হলো প্রথম। অনুষ্ঠান স্থলে বসে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নতুনপ্রজন্মদের বিভিন্ন সংগঠনের যুব কিশোররা। করতালি দিচ্ছে তারা আমিও তাদের সাথে করতালি দিচ্ছি। মনে মনে বলছি এইতো আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সম্প্রীতির ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আগে যা ছিল তা দেখছি আছে এখনও । হযরত আলী পুষ্পেনরা এখনও খেলা করে আমি আর গোপার মতোই। অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে তাহলে কেন বদনাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার? এই প্রশ্ন উঠে মনে। পাশে থাকা অন্তর বলে উঠলো, একশ্রেনীর স্বার্থবাদী, ভ’মি দস্যু,জবর দখলকারী, সুবিধাবাদীরাই এই বদনামের সূচনা করেছে। যারা গোপাদের সাথে কখনো খেলা করিনি, ছোটবেলায় বেড়ে উঠেনি তারাই। বক্তৃতা মঞ্চে চেতনা অচেতনা নিয়ে তারা গলা ফাটিয়ে সুবিধার জন্য সুরের জনপদে অসুর তুলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলো বাতাস গাছ লতাপাতা সবই আছে আগে ছিল যা, কিছু মানুষই শুধু সময়ে সময়ে বদলেছে। সাম্প্রদায়িকতার দীক্ষায় বেড়ে উঠে সুবিধার জন্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার নায়ক সেজেছে কেউ কেউ। মাথা মুড়িয়ে নানা সাজে কেউ চলনে বলনে বসনে আসনে হিরো হয়েছে। আমি অন্তরকে বল্লাম, এতো কিছু বুঝিনা,আমার শুধু গোপাদের কতা মনে পড়ে। আমার সুখ সময়, শৈশবের সেই খেলার সাথী বন্ধু, প্রশান্তি ,সম্প্রীতির গোপার কথা। শিউলী ফুলের হাড়িপাতি খেলা, জগৎবাড়ির সামনের পুকুর, তিতাসের সেই রায়বাবুদের লঞ্চ ঘাট, গুরুচরণ আখরা, কালাইশ্রীপাড়ার পূজা পার্বন সম্প্রীতি সৌহার্দ এসব।

আলোর পথে সংগঠনের অনুষ্ঠানটি বেশী করেই গোপাকে সামনে এনে দিল। আলোর পথে রথে চড়ে আমি যেন গোপাকে ফিরে পেয়েছি। অনুষ্ঠানের মধ্যমনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান পিপিএম বার। সঙ্গে তাঁর সহযোদ্ধা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ইকবাল হোসাইন, সহকারী পুলিশ সুপার সদর মোঃ আবু সাঈদ । শত ব্যস্ততায় সম্প্রীতির জন্য নিবেদিত যাঁরা আচরণে বিচরণে অণুপ্রেরণা দাতা শিক্ষা ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু ভৌমিক,শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব এড. লোকমান হোসেন, উপাধ্যক্ষ জসীম উদ্দিন বেপারী। সবাই পুলিশ সুপারের গুণ মুগ্ধ। কেউ বলছেন মানবতাবাদী,কারো মতে মানবতার ফেরীওয়ালা। আমি বলেছি উনাকে আলোর পথে সুন্দর সম্প্রীতির বাঁশী ওয়ালা। পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান হ্যামিলনের সেই বাঁশী ওয়ালার মতো সুন্দর সম্প্রীতি শান্তির জন্য তাঁর বাঁশীতে সুর তুলেছেন আর সেই সুরের আবহে এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নতুন প্রজন্ম নানা সংগঠনের ব্যানারে সুন্দর সম্প্রীতির জন্য মিছিলে যোগ দিয়েছে। চলছে তারা আলোর পথে। আমিও আছি সেই মিছিলে। আসলে জাগরণের জন্য বেশী মানুষের প্রয়োজন হয়না। আন্তরিক আহবান থাকলে সেই আহবানে জাগরণে আলোড়ন হয়। তেমনিই নানা কাজে তেমন্ইি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন এই পুলিশ সুপার।

গিয়েছিলাম ঢাকায় বন্ধু মেলায়, অন্নদা স্কুলের ৮৭ ব্যাচের বন্ধুরা একই টেবিলে, আগে দেখা হলে যারা বলতো, কিরে তোর তো শুধু সংবাদ ফেন্সিডিল আর কাইজ্ঝা খুনখারাবি নিয়ে, এবার তারা বলছে ভিন্ন কথা, তাদের মুখেই এবার শুনে এসেছি অবিরাম, ক্লিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আমরাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ব্লাড ফর ব্রাহ্মণবাড়িয়া,বন্ধু তোমাকে চাই অসহায় মানুষের পাশে,ড্রিম ফর ডিসএ্যাবিলিটি ফাউন্ডেশন, জাগ্রত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথা। ঢাকায় অবস্থান করে প্রিয় শহরটির প্রতি তাঁদের থাকে কৌতুহল,ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে মিডিয়ার খবরে তাদের মাঝে এখন স্বস্তি, তাদের কাছেই শুনেছি ফকিরাপুলে আধারে আলোর কথা,সাজসজ্জার কথা,স্কুল কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীদের রাস্তা পরিস্কারের কথা ,স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়ার কথা, অনাথ হাবিবার বিয়ের কথা,শহর খালে নতুন ¯্রােতের কথা। সবাই বল্ল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তো তুই অনেক ব্যস্ত। পত্রিকা টিভিতে দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নানা কিছু হচ্ছে , তোকেও দেখা যায়। সুন্দরের ব্যাপক জাগরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। জাগরণের নায়কের নেতৃত্বের কথাও বল্লো তারা। বল্লো তিনি তো জাগরণে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। ৩০ বছর পর বন্ধু আড্ডায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর আমার প্রতি বন্ধুদের ভালবাসার কথা শুনে খুশী হয়েছি।
কথার মাঝে আমি তাদের হারানো গোপার কথা বলেছি। বন্ধুদের মুখে তখন অন্যরকম হাসি রসিকতা। তাদের অনেকেই গোপাকে চিনতো, গোপার হাসি , কথা চলন বলন তাদেরও কারো কারো পছন্দ ছিল। তাদের কেউ কেউ বল্লো, তুই কি গোপাকে পেয়েছিস নাকি? তাদের বলেছি গোপারা ছিল এখনও আছে , আছে শিউলী ফুল , আছে সেই ছোটবেলার হাড়িপাতি খেলা, আছে সেই সম্প্রীতি শান্তির সুখ। অন্যরকম জাগরণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গোপারা এখনও হাসিমুখে বিচরণ করে, গোপাদের সাথে আছে হযরত আলী পুষ্পেশ , তারা চলছে আলোর পথে শান্তির রথে, আমিও আছি তাদের সাথে।

লেখক : সিনিয়র সহ সভাপতি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব, সম্পাদক নতুন মাত্রা।

এ জাতীয় আরও খবর