মঙ্গলবার, ১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং ৫ই পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

চোখের সামনেই মা-বাবাকে হত্যা, বিভৎসতায় কাতর শিশুরা

AmaderBrahmanbaria.COM
সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭
news-image

---

আলজাজিরা : রশিদের বয়স মাত্র ১০ বছর। কিন্তু তার এই ছোট্ট কাঁধেই চেপে বসেছে ছোট বোন ছয় বছরের রশিদা। রশিদ আর রশিদা সেই এক হাজার ৪০০ শিশুর দুজন, যারা সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে মা-বাবা ছাড়াই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর হয়তো এদের কারো কারো মা-বাবাকে সেনাবাহিনী মেরে ফেলেছে কিংবা কোনো না কোনোভাবে পরিবার থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রশিদ জানায়, তাঁর বাবা জাহিদ হোসেন ও মা রমিজা খাতুনকে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে।

রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে রাখাইন রাজ্যে বসবাস করলেও তাঁরা যুগের পর যুগ ধরে মিয়ানমার রাষ্ট্রের নিগ্রহের শিকার। সম্প্রতি সেনা ও পুলিশ ক্যাম্পে ‘বিদ্রোহীদের হামলার’ পর রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নতুন করে হামলা-নির্যাতন-ধর্ষণ শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। আর এতে তাদের সহযোগিতা করছে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী ও মগরা।

জাতিসংঘ একে ‘জাতিগত নিধনের ধ্রুপদী উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রায় চার লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিম পুরুষদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করছে, নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম তাঁরা জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে শরণার্থী শিবিরে আসা শিশুদের নিয়ে কাজ করে ‘দ্য চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস’ (সিএসএফ) নামের একটি সংগঠন। সেখানেই গিয়ে দেখা মিলল রশিদের। এখানে ৬০টি শিশু খেলানা নিয়ে খেলছিল আর কাগজে নানা রং লাগিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করছিল। রশিদ ছিল শান্ত আর কণ্ঠও ছিল দুর্বল।

রশিদ জানায়, সে আরো ছয় ভাই-বোন মা-বাবায়ের সঙ্গে রাখাইনের মংডু জেলার শিকদারপাড়ায় বাস করত। ২৫ আগস্ট তাদের গ্রামে সেনাবাহিনী হামলা চালায়।

হামলার কথা স্মরণ করতে গিয়ে রশিদ বলে, ‘সেদিন ছিল শুক্রবার। হামলা শুরু হলে আমি আমার বোনের হাত ধরে কাছের পাহাড়ের দিকে দৌড় লাগালাম। সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর ফিরে এসে দেখি মা-বাবার লাশ পড়ে আছে।’

নিজের গ্রামে বসে মা-বাবার জন্য শোক করার সময়ও রশিদের হাতে খুবই কম ছিল। সে প্রতিবেশীদের দলে ভিড়ে যায় এবং গ্রাম ছেড়ে যাত্রা শুরু করে। রশিদ বলে, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে আসার জন্য আমি তিন রাত হেঁটেছি। ঈদের একদিন আগে অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।’

রশিদ তার অন্য ভাইবোনদের কোনো খবর পায়নি। সে বলে, ‘আমি শুনেছি আমার অন্য ভাই-বোনদের মেরে ফেলা হয়েছে।’ বিপদগ্রস্ত রশিদ ও তার বোন এক প্রতিবেশীর কাছে আশ্রয় পেয়েছে। তারাই তাদের দয়া করে রেখেছে।

সিএসএফ মূলত ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করে। ইউনিসেফের কর্মকর্তা ফারিয়া সেলিম বলেন, ‘রশিদ যখন প্রথম এখানে আসে, কিছুক্ষণ পর পরই সে আমার কাছে এসে বলত যে, তার মা-বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। প্রথম কিছুদিন সে হতাশ ছিল, তারপর থেকে সে এখানে আসতে শুরু করে।’

রশিদ মিয়ানমারের স্কুলে খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারেনি। কিন্তু এই শিশু সেন্টারটি তার খুব ভালো লাগে, এটি সপ্তাহে ছয়দিন খোলা থাকে। রশিদ একজন স্কুলশিক্ষক হতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে সে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনা শিখাতে পারে।

ফারিয়া সেলিম জানান, শিশুদের চিত্তবিনোদনের জন্য উখিয়া ও টেকনাফে এ রকম ৪২টি শিশু সেন্টার রয়েছে।

‘মা-বাবাকে গুলি করে মারতে দেখেছি’

দিলারা বেগম (১১) এবং আজিজা বেগম (৯) দুই বোন। তারাও মা-বাবাকে হারিয়েছে রাখাইনে। তাদের বাবার নাম মোহাম্মদ হোসাইন আর মায়ের নাম হামিদা বেগম। তাদের বাড়ি মংডু জেলার বারগুজিবিল গ্রামে। বড় বোন দিলারা এখনো সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আজিজা জানায়, দুপুরের আগে আগে সে, দিলারা, ভাই মোস্তাকিনসহ অন্য ভাইবোনেরা মিলে বাড়ির সামনে খেলা করছিল। বাবা তখন কাজের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই সময় তারা গুলির শব্দ শুনতে পায়। শব্দ শুনেই আজিজা একটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে।

‘আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে দেখছিলাম, সেনা সদস্যরা আমার মা-বাবাকে গুলি করছে। তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর একটা বড় ছুরি দিয়ে বাবার গলা আর মায়ের পেট কেটে দেয়’, কাঁদতে কাঁদতে বলে আজিজা। এ ঘটনার পর সে আর বাড়ি ফিরতে পারেনি, এ সময় বোন দিলারাও হারিয়ে যায়।

আজিজা বাড়ির অদূরে পাহাড়ের কাছে কিছু প্রতিবেশীকে দেখতে পায়, তখন সে তাদের কাছে মা-বাবাকে গুলি করে হত্যার কথা বলে। তাঁরা তখন তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হয়। বাংলাদেশে আসার পর একটি শরণার্থী শিবিরে হারিয়ে ফেলা বড় বোন দিলারা ও মানসিক রোগী ভাই মোস্তাকিনকে খুঁজে পায় আজিজা। মোস্তাকিনের গায়েও গুলি লেগেছিল। এখন সে সুস্থ হয়ে উঠছে। আজিজার বাকি আট ভাইবোন রাখাইনে মারা গেছে। আজিজা মংডুতে একটি স্কুলে পড়াশোনা করতো কিন্তু সেখানে প্রায় প্রতিদিনই সেনাবাহিনীর লোকজন আসত বলে পরে সে আর যায়নি। বড় বোন দিলারা একেবারেই স্কুলে যায়নি।

আজিজার সঙ্গে যখন আলাপ হচ্ছিল, তখন তার পাশেই বড় বোন দিলারা বসা ছিল। ভাই মোস্তাকিন একজন আত্মীয়ের কাছে থাকে। আজিজা জানায়, বাংলাদেশে তার খুবই ভাল লাগছে। কারণ এখানে কেউ তাদেরকে হত্যা করতে পারবে না। এখানে তার অনেক বন্ধু তৈরি হয়েছে। এখন সময়টা তাদের ভাল কাটছে। আজিজা পড়াশোনা করতে চায়।

‘মা-বাবার স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে’

নয় সদস্যের পরিবারের মধ্যে নূর হোসেন (১২) আর তার সাত বছরের ছোট বোন জহুর বেগমই কেবল বেঁচে আসতে পেরেছে। তাদের বাড়ি ছিল মংডু জেলার রদিওংসংয়ে।

২৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে তাদের গ্রামে হামলা শুরু করে সেনা সদস্যরা। তখন নূর হোসেন তার বোনের হাত ধরে অন্যান্য গ্রামবাসীর সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করে। সেই হামলার বাবা সুলতান আহমেদ ও মা হাজেরা খাতুন মারা যান। গ্রামের বড়রাই তাদেরকে বাংলাদেশ পর্যন্ত নিয়ে আসে। বাংলাদেশে আসার পর নিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরের একটি স্কুলে নূর হোসেন তার গ্রামের আরো চার বন্ধুর দেখা পায়। নূর হোসেনও একসময় মিয়ানমারে স্কুলে পড়াশোনা করত। কিন্তু সে এখন আর স্কুলের নাম মনে করতে পারছে না।

নূর হোসেন বলে, ‘আমাদের স্কুলে রাখাইন আর রোহিঙ্গারা একসঙ্গে পড়াশোনা করত। কিন্তু দুই বছর পরই রোহিঙ্গা শিশুদের আলাদা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়।’

মিয়ানমারে ফুটবল খুব জনপ্রিয়। নূর হোসেনও একসময় ফুটবল খেলতে ভালোবাসত। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভয়ে সে খেলা ছেড়ে দিয়েছে। নূর হোসেন বলে, ‘এখানে সেনাবাহিনীর ভয় নেই। কিন্তু মা-বাবার স্মৃতি আমাদের তাড়িয়ে ফেরে। তারা আমাকে খুব ভালোবসত, কিন্তু এখন তাঁরা কোথাও নেই।’

‘সেনাবাহিনী এসেই এলোপাতাড়ি গুলি চালায়’

১১ বছরের বালিকা আনজুমান এসেছে বুচিডংয়ের সাহেব বাজার গ্রাম থেকে। তার বাবার নাম গুরু মিয়া আর মায়ের নাম শামসুন্নাহার। যেদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি আক্রমণ করে, সেই দিন-তারিখটা সঠিক মনে নেই তার। সেদিন আনজুমান আর তার ভাই-বোনেরা নিজেদের বাড়িতেই ভগ্নিপতি বাহাদুর হোসেনের সঙ্গে খেলা করছিল।

‘এ সময় হঠাৎ করেই সেনা সদস্যরা আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করে। এসেই তারা এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করে। ভগ্নিপতি তখন দৌড় দিলেও রক্ষা পায়নি।’

আনজুমান জানায়, সেই হামলায় তার মা-বাবাসহ পরিবারের ১০ সদস্য মারা যায়। সে বাংলাদেশে এসেছে তার বড় ভাই আনোয়ারের (৩৫) সঙ্গে।

কুতুপালং শিশু সেন্টারের (সিএফএস) আউটরিচ কর্মকর্তা শাপলু বড়ুয়া বলেন, “এখানে আসা অধিকাংশ শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যেমন রশিদের কথাই ধরুন, তাঁকে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এখানে আসার পর থেকেই সে বলে যাচ্ছে, ‘তাঁরা আমার মা-বাবাকে মেরে ফেলেছে’।”

শাপলু আরো জানান, শিশু সেন্টারে এখানে দুই ধরনের শিশু আছে। চার থেকে ১১ পর্যন্ত আর ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। এর মধ্যে চার থেকে ১১ পর্যন্ত যারা, তাদের অবস্থা বেশি খারাপ। এখানে শিশুদের নিজেদের মধ্যে বন্ধনকে শক্তিশালী করা এবং মিয়ানমারে তারা যে মানসিক আঘাত পেয়েছে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা হয়।