সোমবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেননি সু চি?

AmaderBrahmanbaria.COM
অক্টোবর ১৭, ২০১৭
news-image

---

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সেনা অভিযানকে কেন্দ্র দেশটির বেসামরিক সরকারের প্রধান অং সান সু চি ও সেনাবাহিনী প্রধানের মধ্যকার বিরোধ সামনে চলে আসছে। দেশটিতে নিযুক্ত কূটনীতিকরা আগেই আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, সেনাবাহিনী চাইছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুন সু চি। আর এবার জানা গেলো, সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কাতেই সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সু চি যোগ দেননি।

মিয়ানমারের নির্বাসিত কয়েকজন সাংবাদিকের থাইল্যান্ড থেকে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ইরাবতির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেয়েও দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বেশি চাপের মুখে ছিলেন দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি। ফলে অধিবেশনে যোগ দেওয়ার চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো মোকাবিলাই প্রাধান্য পেয়েছে সু চির কাছে।

মিয়ানমারের সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে ইরাবতির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাখাইনে সহিংসতা শুরুর সময় থেকেই দেশটির প্রেসিডেন্ট ইউ হতিন কিয়াউ ব্যাংককে চিকিৎসাধীন। দেশটির শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা ক্লিয়ারেন্স অভিযানের সময় রাখাইনে জরুরি আইন জারি করতে চেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সু চি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে গেলে সেনাবাহিনী সেখানে জরুরি অবস্থার জারি করতে পারত। কিন্তু রাখাইনে সংকট শুরুর প্রথম দিন থেকেই সু চি জরুরি অবস্থা জারির বিরোধিতা করে আসছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইউ মুইন্ট সয়ে একজন সাবেক শীর্ষ জেনারেল এবং ইউ থেইন সেইন সরকারের শাসনামলে ইয়াঙ্গুনের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি সাবেক সেনা শাসক সিনিয়র জেনারেল থান শয়ের আমলে সেনাবাহিনীর কট্টরপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাকেই জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার জন্য পাঠান সু চি। আর সু চি নিজে কূটনীতিকদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। প্রেসিডেন্ট ব্যাংকক থেকে ফিরে এলেও সু চি চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগে নির্ধারিত সফর বাতিল করেন। এ সময় তিনি ব্রুনেইতে যান। সেখানে তিনি বেশ কয়েকজন এশীয় রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধান অনুসারে, দেশটির সেনাবাহিনীও কিছু শর্তসাপেক্ষে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে। তবে সেনাপ্রধানের একক ক্ষমতা থাকলেও ছয় মাস বা তার বেশি সময়ের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে অবশ্যই তাকে দেশটির ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনডিএসসি) অনুমোদন নিতে হয়।

ইরাবতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনও সেনা অভ্যুত্থানের গুজব বিরাজমান। চীন, ভারত ও মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরা দেশটির ক্ষমতার পথ পরিক্রমার ওপর নজর রাখছে। দেশগুলো জানে, সু চি ও সেনাপ্রধানের মধ্যকার সম্পর্ক এখন অনেক শীতল।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে সু চি’র ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশটিতে নিযুক্ত কূটনীতিকরাও মিয়ানমারের সমালোচনায় মুখে কুলুপ এঁটেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাতিগত দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও মিয়ানমারকে সফল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চি ২০১৫ সালে মিয়ানমারের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভাবা হয়েছিল দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা হিসেবে সু চি কাগজে-কলমে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার কাছে তিনি দুর্বলই থেকেছেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে শাসন করা সামরিক বাহিনী ঠিকই তাদের ক্ষমতা ধরে রেখেছে। রোহিঙ্গাদের হত্যার নির্দেশও এসেছে সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লায়াংয়ের কাছ থেকে, সু চি এমন নির্দেশ দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনীতিকরা দাবি করেন, সু চি ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করলেও জনসমক্ষে বলতে পারেন না।

আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ইয়াঙ্গুনে থাকা কূটনীতিকরাও চাপ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পর্যবেক্ষকরা দাবি করেছেন, নোবেলজয়ী সু চি বিশ্বের কাছে নিন্দিত হোন— এটাই চেয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। মিয়ানমারে অনেকদিন মানবাধিকার নিয়ে গবেষণা করে আসছেন ডেভিড সক্ট ম্যাথিসন। তিনি বলেন, ‘সব সমালোচনা হয় সু চির বিপক্ষে। আর এদিকে তাতমাদাও (মিয়ানমারের সেনাবাহিনী) যা খুশি করতে যাচ্ছে। আগের মতোই সেনাবাহিনী গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে ও বাড়িঘর ধ্বংস করছে।’

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে ছয় জন কূটনীতিকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সু চি রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আর রাখাইন হত্যাকাণ্ডের মূল ক্রীড়ানক সেনাপ্রধান মিন অং। রোহিঙ্গা সংকটে সু চির হৃদয় ভেঙে পড়েছে বলে তার একজন উপদেষ্টাও রয়টার্সের কাছে দাবি করেছেন।

সু চির ওই উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা যথেষ্ট প্রত্যয়ী। তবে তিনি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে চান। তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তা দেখে তিনি ভেঙে পড়েছেন। তিনি এ নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। আমি জানি, তার এই উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে আমি জানি, তিনি নিশ্চয় পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাবেন।’

ইয়াঙ্গুনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং সাবেক রাজনৈতিক বন্দি খিন জ উয়িনের বক্তব্যেও সু চির সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তার মতে, অতীত ও বর্তমান— উভয় ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর ওপর সু চির প্রভাবের মাত্রা শূন্য।

রয়টার্স ও গার্ডিয়ানের অন্য দুইটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনকে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনার চেষ্টা করছেন সু চি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সু চির এক উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করা হয় প্রতিবেদনে। ওই উপদেষ্টা সু চির খুবই ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। টেলিফোনে উপদেষ্টা জানান, ‘তার একটাই চিন্তা, কেমন করে এই সংকট দূর করা যায়। কেমন করে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম, সমন্বয় আর পুনঃনির্মাণের ক্ষমতা বেসামরিক সরকারের হাতে দেওয়া যায়।’

ওই উপদষ্টোও সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টি ইঙ্গিতে বলেছেন। তিনি জানান, সু চি একটি যথাযথ রাস্তা খুঁজছিলেন। কারণ শঙ্কা ছিল, সেনাবাহিনী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। ‘যেটা তার কাছে পরিষ্কার ছিল না, সেটা হলো কী করে তিনি এটা করবেন। কী করে তিনি বেসামরিক সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা তুলে দেবেন।’, বলেছেন ওই উপদেষ্টা।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং সীমান্তসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ এখনও রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। এর অর্থ হচ্ছে, দেশটির পুলিশের ওপরও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনাবাহিনীর। শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের ১১টি আসনের মধ্যে ছয়টি আসনেও রয়েছেন সেনাবাহিনী মনোনীত ব্যক্তিরা। গণতান্ত্রিক সরকার বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে এই পরিষদের। এছাড়া অনেক শীর্ষস্থানীয় পদ দখল করে আছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা।