সোমবার, ২০শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

শেভিং ফোমেও দুই নম্বরী !!

AmaderBrahmanbaria.COM
অক্টোবর ১৭, ২০১৭
news-image

---

বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : ‘‘ভাই, পাবলিক যাইব কই! খাবার-দাবার, মুদি-স্টেশনারি, ওষুধপত্র সবকিছুতেই ফরমালিন মার্কা ভেজালসহ নানা কেমিক্যাল দিয়া বাঙালিরে দিনদিন মাইরা ফালাইতাছে। অহন দেখতাছি শেভিং ফোমেও ভেজাল রে ভাই। গত কাইল শখ কইরা বাজারের একটা দোকানে শেভ করাইছিলাম ফোম দিয়া। ৫০ টাকা লাগছে। আইজ সকালে ঘুম থাইক্ক্যা উইঠ্যা দেহি, গাল-মুখ সব ফুইল্লা গেছে। ভয়ে দৌড়াইয়া সরকারি হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার কইলো, এইডা নাকি গালের চামড়াতে এলার্জি ও শেভ করার সময় খারাপ কেমিক্যাল থাকার কারণে মুখ-চোখ ফুইল্লা গেছে।’’

ক্ষোভ নিয়ে এমন ভাষায় অভিযোগ করছিলেন বাঞ্ছারামপুর সদর উপজেলার সোনারামপুরের বাসিন্দা আবুল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, নারী-শিশুসহ যারা বিউটি পার্লারে যায়, তাদের মুখেও ভেজাল ফেসিয়াল ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় কয়েক শ সেলুন আছে। অভিযোগ রয়েছে, এর প্রায় সবগুলোতেই ভেজাল শেভিং ক্রিম ও ফোম দিয়ে শেভ করানো হচ্ছে। নকল শেভিং ক্রিমের কারণে মুখের ত্বকের সমস্যায় ভুগছেন অনেকে। বিশেষ করে, যাদের অ্যালার্জি সমস্যা রয়েছে, তাদের ৯৯% মানুষ ভেজাল কেমিক্যালযুক্ত ফোমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন। বিসিএসআইআর, ঢাকা থেকে এগুলোর মাননিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা করে বাজারে ছাড়ার কথা থাকলে বাস্তবে এগুলো পরীক্ষিত নয়।

এসব ভেজাল শেভিং ফোম তৈরি হচ্ছে রনস্ কোং, জিলেট, গোল্ডেন- এ রকম নামী-দামি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, জিনজিরা, নয়াবাজার, চকবাজার, পাটুয়াটুলী থেকে এসব ভেজাল পণ্য বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধতা নেই। নেই কোনো অনুমোদন।

৪৭০ গ্রাম ওজন এবং টেস্টেট বাই বিসিএসআইআর, ঢাকার একটি শেভিং ফোমের বাজারমূল্য যদি রনস্ কোং, গোল্ডেন কোং হয়ে থাকে তবে ২৮০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু ভেজাল ফোমের মূল্য মাত্র ১০০ টাকা।তা-ও,আবার প্রতি সপ্তাহে পার্টি এসে বাঞ্ছারামপুওে দিয়ে যায়-জানান বাঞ্ছারামপুর পৌর এলাকার এক সেলুনের মালিক।

বেশি মুনাফার আশায় সেলুন মালিকরা গ্রাহকদের ত্বকের কথা না ভেবে ভেজাল ফোন-ক্রিম দিয়ে শেভ করাচ্ছেন। আর গ্রামাঞ্চলের সরল-সাধারণ মানুষ না জেনেই এগুলো ব্যবহার করছেন সেলুনে গিয়ে। পার্লারে গিয়ে এ ধরনের ভেজাল পণ্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি আসল শেভিং ফোম ও ফেসিয়ালে যে কেমিক্যাল থাকে, তার মধ্যে আছে অ্যাকুয়া, স্টিয়ারিক অ্যাসিড, পালমিটিক অ্যাসিড, ইডিটিএ, ট্রিথারনোলাইন, আইসোনবিউটেন, লরেথ-২৩, সোডিংয়াম লরি, সালফেট, গ্লিসারিন, প্রোপিলিন গ্লাইকোল, বোটেন, প্রোপেন, ফ্রাগরেন্স। কিন্তু ভেজাল ফোমে সাবানের গাঢ় ফেনা ও সুগন্ধি অ্যারোমেটিক ছাড়া আর কিছুই নেই।

ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. ইশরাত জাহান ভূঁইয়া জানান, ভেজাল ফোম ব্যবহার করলে ত্বকে তো বিভিন্ন সমস্যা হবেই, এমনকি ত্বকের ক্যানসারও হতে পারে। এ ছাড়া, মুখের ব্রণ, গুটি, ত্বক দেবে যেতে পারে। অভিযোগকারী আবুল হোসেন প্রাথমিকভাবে যে সমস্যাটিতে ভুগছেন, সেটিকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় পালমুনারি রি-অ্যাকশন ফর টিউবারকলোসিস। এ থেকে ক্যানসারও হতে পারে।

নিম্নমানের নকল ও ভেজাল প্রসাধন সামগ্রীর প্রভাব সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিকেল কলেজের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবহারে ত্বকের সাধারণ লাবণ্যই শুধু নষ্ট হয়ে যায় না। এর ব্যবহারে প্রাথমিকভাবে ব্যবহারকারীর কন্টাক্ট ডারমাটাইসিস হয়, চামড়া লাল হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন তৈরি করতে পারে। এমন কি স্কিন ক্যান্সার হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। নকল ও নিম্নমানের এ সকল প্রসাধন সামগ্রীতে যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে তা মাত্রাতিরিক্ত এবং কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই, ফলে এলার্জি, ক্ষত, চামড়া কালো হয়ে যাওয়া, একজিমা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিনদিন বাড়ছেই।

এসব পণ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বনামধন্য বিউটিশিয়ান হোমনার মিসেস আখি মিজান বলেন, ‘ত্বক আাক্রান্ত যেসব মানুষ আমাদের কাছে আসে তাদের প্রায়েরই মুখে কালো দাগ, রাশ, গোটা, এলার্জি, অত্যাধিক ঘাম ঝরা অন্যতম। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যখন জানতে চাইলে তারা কিছু ক্রিম, লোশনের কথা বলে। যেগুলোকে আমরা পরীক্ষা করে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান পেয়েছি যার ইমিডিয়েট এলার্জিক রিঅ্যাকশনে মানুষ মারা পর্যন্ত যেতে পারেন।