শনিবার, ২৩শে জুন, ২০১৮ ইং ৯ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বন্যপ্রাণী চোরাচালানের অন্যতম রুট আফগানিস্তান

news-image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কাঁপছে কাবুল৷ রক্তাক্ত কান্দাহার৷ গত পাঁচ মাসে ১০টি জঙ্গি হামলা, নিহত অন্তত ৩০০৷ কে নেই জঙ্গিদের নিশানায় ? বিদেশি কর্মকর্তা থেকে সেনা কর্মকর্তা, এমনকী শিশুরাও৷ দেশের ৭০ শতাংশ এলাকায় তালেবানদের চোখরাঙানি৷ মানুষের জীবন বাঁচানোটাই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ৷

কিন্তু সেখানেই আর থেমে থাকছে না আফগান প্রশাসন৷ বরং এই কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশের বন্যপ্রাণ বাঁচানোর এবং বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত অপরাধ রোখার লড়াইয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে চাইছে স্নো লেপার্ড আর টিউলিপের দেশ৷ প্রাথমিকভাবে তাতে কিছু সাফল্য এলেও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে এখনও পর্যন্ত ব্যর্থতাই বেশি৷ কিন্তু কোথাও থেকে শুরু তো করতে হবে, সেটাই আপাতত ভাবছে প্রতি মুহূর্তে তালেবান ও আইএস জঙ্গিদের নিশানায় থাকা দেশটা৷

সম্প্রতি সাউথ এশিয়া ওয়াইল্ডলাইফ এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কের (সাওয়েন) একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকে কলকাতায় এসেছিলেন আফগানিস্তানের জাতীয় পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (ডিএম ) গোলাম মুহাম্মদ মালিকিয়ার৷

সেখানেই তিনি জানান, গত ৪-৫ বছর ধরে তারা দেশে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ রক্ষার জন্য আইন ও নীতি তৈরির চেষ্টা করছেন৷ সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি জাতীয় নীতি তৈরিও হয়েছে এবং বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত অপরাধে শাস্তিদানের সুযোগও এসেছে৷ কীভাবে চোরাচালান হয় আফগানিস্তানে?

মালিকিয়ারের কথায়, ‘গত বছর আমরা কান্দাহার সীমান্তে হঠাৎ চারটি পূর্ণবয়স্ক সিংহ উদ্ধার করি৷ কন্টেনারে করে সেগুলি কোথাও পাচার হচ্ছিল৷ অথচ আফগানিস্তানে সিংহ নেই৷ বোঝাই গেল, বাইরে থেকে সেগুলি আনা হয়েছে এবং নজরদারির ফলে পাচারকারীরা পালিয়েছে৷ সিংহগুলো এখন কাবুল চিড়িয়াখানায়৷ দিব্যি রয়েছে।’

একই সঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন, ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দামি উদ্ভিদ, পশুর চামড়া, দেহাংশ, এমনকী নামী-দামি বিদেশি পাখি পাচারের জন্যও আফগানিস্তান সীমান্তকে ব্যবহার করা হয়৷

‘সীমান্ত বলতে কিন্তু সব সময় সরকারিভাবে স্বীকৃত সীমান্ত বলছি না৷ যেমন ইরান, পাকিস্তান বা তাজিকিস্তানের সঙ্গে রয়েছে৷ বলছি সেই সব বেআইনি রুটের কথা, যা গত অনেক বছরের অশান্ত পরিস্থিতির ফলে তৈরি হয়েছে।’

এই পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে নেমে বাছাই করা হচ্ছে দেশের ‘বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট’গুলিকে৷ যেখানে মানুষের সঙ্গে পশুর সংঘাত বেশি, সেখানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে৷ বন পুনর্গঠন থেকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো- সব কিছু নিয়েই প্রকল্প গৃহীত হয়েছে৷ সবথেকে বড় কথা, পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে চোরাচালানের সুরক্ষিত পথ হিসেবে আফগানিস্তানের যে দুর্নাম রয়েছে, সেটা ঘোচাতে বদ্ধপরিকর মালিকিয়ার৷

বিশ্বে স্নো লেপার্ডের অন্যতম বড় বাসস্থান ওয়াখান করিডোরই আফগানিস্তানের সঙ্গে চীন-পাকিস্তান-তাজিকিস্তানের সীমান্ত এলাকায়৷ সেখানে পর্যটকরাও যান৷

জাতিসংঘের তথ্য বলে, প্রতি বছর প্রচুর স্নো লেপার্ড মারা পড়ে বিশ্ব জুড়ে৷ ৫০ শতাংশ মারা পড়ে গ্রামবাসীর হাতে, ২০ শতাংশ মারা যায় অন্য জন্তুর জন্য পাতা জালে পা দিয়ে, আর ২০ শতাংশ খুন হয় সাদা লোমের লোভে৷ ওয়াখান করিডোরে দেড়শো স্নো লেপার্ড ও প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বাস৷

মালিকিয়ারের কথায়, ‘এখন ফরেস্ট রেঞ্জার , বনকর্মীদের দল তৈরি হয়েছে৷ বসতি এলাকায় জন্তু-জানোয়ারের হামলা হলে তারা যায়৷ গ্রামবাসীদের বোঝায় বন্যপ্রাণী মারতে নেই৷ সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, তবে আস্তে আস্তে৷ সে কাজে ভারতও আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র হিসাবে অনেক সাহায্য করছে৷’ কতটা কঠিন এই পথ?

‘কলকাতায় যে বৈঠকে এসেছি, সেটা কাবুলে হওয়ার কথা ছিল৷ সাওয়েন-এর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা কাবুলে এসে বন্যপ্রাণ বাঁচানোর রুটম্যাপ বানালে তা দেশের জন্য মাইলস্টোন হতে পারত৷ কিন্তু গত ২১ মার্চ কাবুলে আন্তঘাতী বিস্ফোরণে ৩৩ জন মারা গেল৷ তারপরে আর ওখানে বৈঠকের সম্ভাবনা দেখিনি৷ এত দেশের প্রতিনিধি থাকবেন, যদি কিছু ঘটে যায়…’ – বলছিলেন মালিকিয়ার৷

যে দেশে মানুষের প্রাণের দাম নেই, সেখানে এভাবেই বন্যপ্রাণ বাঁচাচ্ছেন দৃঢ় সংকল্প আফগানরা৷ আফগান সীমান্ত এলাকায় ওয়াখান জাতীয় উদ্যানে বন্যপ্রাণ রক্ষার ডাক৷ এখানেই স্নো লেপার্ডের বাসস্থান৷ দেশের অন্যত্রও রয়েছে বেশ কয়েকটি ‘বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট’ ইউএনডিপি, উইকিমিডিয়াকমন্স৷ সূত্র: এই সময়

Print Friendly, PDF & Email