সোমবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ওজন কমাতে রাতে ঘুমানোর আগে পান করুন এই তিন চা

news-image

শরীরের স্থূলতা নিয়ে কমবেশি সবার মাঝে একধরনের চিন্তা কাজ করে। ইদানীং ওজন কমাতে ভারী শরীরের অধিকারীরা নানা পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। কিউ যাচ্ছেন জিমে, কেউ ডায়েট কন্ট্রোল করছেন, কেউবা সকাল-বিকাল হাঁটাহাঁটি করছেন। যারা শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে রাতদিন নানা চিন্তায় মগ্ন এ লেখাটি তাদের জন্যই।

ঘুমানোর আগে নিয়ম করে মাত্র তিনটি পানীয় পান করলেই অতিরিক্ত ওজন থেকে পরিত্রাণ মিলতে পারে বলে আয়ুর্বেদ গবেষক ডা. আশুতোষ গৌতম জানিয়েছেন। আর সেটি পান করতে হবে বিছানায় যাওয়ার আগে, অর্থাৎ ঘুমানোর আগে। এ সম্পর্কে আশুতোষ বলেন, ‘ওজন কার্যকরভাবে হ্রাস করার জন্য একটি ভালো পাচনতন্ত্র থাকতে হবে। আর একটি উন্নত পাচনতন্ত্র হলো ওজন কমানোর যাত্রার প্রথম ধাপ।’ আর উন্নত পাচনতন্ত্র তৈরিতে যে তিনটি পানীয় কার্যকর ভূমিকা রাখে সে তিনটি পানীয় ঘুমানোর আগে নিয়মিত পান করার পরামর্শ দেন তিনি। নিচে প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য সে তিনটি পানীয়র গুণাগুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে তুলে ধরা হলো।

সূত্র: এনডিটিভি

দারুচিনি চা

বলা হয়ে থাকে, দারুচিনি হলো বিভিন্ন স্বাস্থ্য-উপকারী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মসলা। এর রয়েছে দারুণ ভেষজ গুণ। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, দারুচিনিতে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং এন্টিবায়োটিক। দারুচিনি কার্যকরভাবে ইনসুলিনের কাজ করে। সে অর্থে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী একটি মসলা। দারুচিনি দেহের এলডিএল বা খারাপ কোলস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

দারুচিনি পাকস্থলীর ভেতরের খাবারের চলাচলকে ধীর করতে সাহায্য করে। এর ফলে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এই এটি বেশ উপকারী। এই মসলাটি বিপাকক্রিয়াও পরিবর্তিত করতে পারে। যার ফলে দেহ তার অতিরিক্ত শর্করাকে চর্বিতে পরিণত হতে না দিয়ে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়। তাই নিয়মিত এর নির্যাস পান করলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি ধীরে ধীরে কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে দারুচিনির পানি খেলে উপকার পাওয়া যাবে বেশি।

দারুচিনির চা যেভাবে বানাবেন

১. দারুচিনি গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ,
২. খাঁটি মধু দেড় টেবিল চামচ এবং
৩. পানি ২ গ্লাস

প্রথমে ২ গ্লাস পানি ২০-৩০ মিনিট ফুটিয়ে তাতে ২ টেবিল চামচ দারুচিনি গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে ১৫ মিনিট ঢেকে রেখে দিন। তারপর সেটাতে দেড় টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে এক গ্লাস সকালে খালি পেটে আর এক গ্লাস রাতে ঘুমানোর আগে পান করুন। সকালে খাওয়ার পর বাকি এক গ্লাস যদি ফ্রিজে রাখতে চান তাহলে রাতে যখন পান করবেন, তার আধা ঘণ্টা আগে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখুন, তারপর পান করুন।

সতর্কতা: সবকিছুরই ভালো দিকের পাশাপাশি কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকে। তাই খুব বেশিদিন অর্থাৎ একটানা বা ছয় সপ্তাহের বেশি দারুচিনির চা পান করবেন না। একটানা পান করতে চাইলে সপ্তাহে পাঁচ দিন পান করে দুই দিন বন্ধ রাখতে পারেন। এ ছাড়া যাদের কিডনি ও লিভারের রোগ রয়েছে তারা পান করবেন না। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তারাও শর্করার মাত্রা চেক করে তারপর পান করবেন। অনেকের অ্যালার্জি থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে একটানা না খেয়ে বিরতি দিয়ে পান করুন।

মেথি চা

ডা. আশুতোষের মতে, মেথি বীজ ওজন হ্রাসকে বিপুল পরিমাণে সহজ করে দেয়। মেথি দানার নিয়মিত ব্যবহার শরীরে তাপ উৎপন্ন করে এবং ওজন কমানোর জন্য সাহায্য করে। মেথি ভালো অ্যান্টিসিড হিসেবে কাজ করে। এটি হজমক্রিয়া শক্তিশালী করে। মেথি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহযোগিত করে। তাই নিয়ম করে মেথি পানি বা চা পান করলে শরীর বেশ ঝরঝরে হবে।

যেভাবে মেথি চা তৈরি করবেন

প্রথমে মেথি দানাগুলো চূর্ণ করে নিন। এরপর একটি পাত্রে পানি নিয়ে চুলায় ফুটতে দিন। পানি ফুটে উঠলে তাতে চূর্ণ করা মেথি দানা দিন। তিন-থেকে পাঁচ মিনিট ফুটতে দিন। এরপর আঁচ বন্ধ করে ঢেকে রাখুন। ঠান্ডা হলে একটি কাপে ছেঁকে পান করুন মেথি পানি।

মনে রাখবেন, ঘুমানোর আধা ঘণ্টা আগে এ পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এক কাপ মেথি পানি শরীরের স্থূলতা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ক্যামোমিল চা

ক্যামোমিল মূলত একটি ওষুধি উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদের ফুলের নির্যাস শরীরের তাপমাত্রা কমাতে জাদুকরি কাজ করে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর নির্যাস স্নায়বিক সমস্যায় যারা ভুগে থাকেন তাদের পান করতে বলা হয়। সাধারণত এটি সিন্সাইটিস এবং জেনেটিক্যাল সিস্টেমের অন্যান্য রোগের সঙ্গে পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রদাহ অপসারণ এবং বিষক্রিয়াগত মাথাব্যথা থেকে পরিত্রাণ পেতে এর নির্যাস বেশ কাজ করে। এটি রক্তে শর্করার পরিমাণও হ্রাস করে।

গবেষকরা জানান, ক্যামোমিল চা পানে থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। ৫০০ জন গ্রিক চাপ্রেমীর ওপর গবেষণা চালিয়ে এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই মত দিয়েছেন। এদের মধ্যে ১১৩ জন ছিলেন সরাসরি থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী। ২৮৬ জন ছিলেন থাইরয়েড রোগাক্রান্ত আর ১৩৮ জন ছিলেন সুস্থ।
ইউরোপীয় জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ক্যামোমিল চা পানে থাইরয়েড রোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

সপ্তাহে দুই থেকে ছয়বার এই হারবাল চা পান করলে থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে ৭০ ভাগ, আর থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে ৮৪ ভাগ।

ক্যামোমিল ফুলের চা স্বাস্থ্যের জন্য, বিশেষ করে আমাদের ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। এতে ময়েশ্চারাইজিং বৈশিষ্ট্য। এ চা চামড়ার ব্লিচ হিসেবে কাজ করে, চুলকানি দূর করে, চামড়ার পোড়া দাগ শীতল করে এবং ত্বক উজ্জ্বল করে।

এই জাদুকরী চা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসসমৃদ্ধ, যা ত্বকের ব্রণ এবং দাগের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এটি ত্বককে র‌্যাডিকেলের ক্ষতি এবং অকালবার্ধক্য থেকে রক্ষা করে। তারুণ্য ধরে রাখতেও এর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

ক্যামোমিল চা ওজন হ্রাসে বেশ কাজ করে। ঘুমের আগে গরম ক্যামোমিল চা নির্বিঘ্ন ঘুমে ভালো সাহায্য করে। অনিদ্রা দূর করার প্রাকৃতিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্যামোমিল চা বেশ জনপ্রিয়। ক্যামোমিলে থাকা apigenin নামক যৌগে রয়েছে প্রশান্তিদায়ক গুণাগুণ। এক কাপ ক্যামোমিল চা মধু মিশিয়ে পান করলে অনিদ্রা দূর হয়। এই চায়ের মধ্যে রয়েছে সেসকুইটারপেন ল্যাকটোন উপাদান, যা লিভারকে পরিশোধন করে। এর মধ্যে রয়েছে প্রদাহরোধী উপাদান, এটি শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে উপকারী।

যেভাবে বানাবেন ক্যামোমিল চা

প্রথমে একটি পাত্রে এক কাপ চায়ের পরিমাণ পানি নিয়ে তা চুলায় চড়ান। পানি ফুটে উঠলে তাতে ১ চা চামচ ক্যামোমিল ফুল চূর্ণ দিন (ফুলগুলো আগে কড়কড়া করে শুকিয়ে রাখতে হবে)। এরপর তাতে পুদিনা পাতা দিন। ৩-৪ মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে তাতে টি-ব্যাগ দিন। টি-ব্যাগের রং ছেড়ে দিলে তাতে শুকিয়ে রাখা ৩-৪টি ভাজা ক্যামোমিল ফুল দিন। ইচ্ছে করলে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস তাতে দিতে পারেন। হালকা চিনিও দিতে পারেন।