মঙ্গলবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মজার ব্যবসা মাজার ব্যবসা

news-image

রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়, পথে ঘাটে কিংবা অফিসের সামনে নানা রকমের চার শতাধিক দানবাক্স শোভা পাচ্ছে। এসব দানবাক্স থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। মাজার ও পীরের নামেই চলছে এ দানবাক্স বাণিজ্য। লাল-কালো, ছোট-গোল ও চুকানো দানবাক্সই মূলত ঝুলিয়ে রাখা হয়। পুজিবিহীন এই ধর্মীয় বাণিজ্যে বছরে আয় হয় দুইকোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জে দানবাক্সের সংখ্যা প্রায় ৪’শতাধিক। বিভিন্ন কাঁচাবাজার, চালের আড়ৎ, পীরের মাজার, মসজিদ-মাদ্রাসার প্রবেশ পথ, নদীর ঘাট, বাস-বেবি-রিকসা ষ্টেশন কিংবা অফিসের সামনে এক ধরণের টিনের তৈরি ছোট দানবাক্স দেখা যায়। যার গায়ে বিভিন্ন পীরের নামে দান করার আহবান জানানো হয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রূপগঞ্জে যেসব পীরের নামে দানবাক্স চালু রয়েছে তার মধ্যে ইয়ারউদ্দিন (রঃ), চন্দ্রপাড়া (রঃ), শাহবাবা ফরিদপুরি (রঃ), খাজা মঈনউদ্দিন চিশতিয়া (রঃ), শর্ষিনা পীর (রঃ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পীরের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা ও সম্মান দিয়ে একশ্রেণির খাদেমরা এর দেখাশোনা করছেন। তবে ঐ টাকার সিংহভাগই খাদেমগণ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দানবাক্সের টাকায় পীরের মাজার উন্নয়নে ব্যবহারের নজির খুবই কম বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, ধর্মীয় ভাবাবেগে জনগণ এসব দানবাক্সে দান করে থাকেন। বাজার শেষে, নদী পার হয়ে, চাল কিনতে গিয়ে, মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে ও কোন অফিসে কাজে গেলে ধর্মীয় ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে মানুষ এক টাকা থেকে দশ টাকা দানবাক্সে দান করে। আর এসব অর্থ দানবাক্স চালুকারী ব্যক্তির তহবিলে থেকে যায়।

উপজেলার কামসাইর এলাকার আমানুল্লাহ মোল্লা বলেন, পুঁজি ছাড়া মজার ব্যবসা হচ্ছে মাজার ব্যবসা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জের আধুরিয়া, গোলাকান্দাইল, ভুলতা, মুড়াপাড়া, রূপসী, কাঞ্চন, তারাবো, গন্ধবপুর, দিঘীবরাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব দানবাক্স রয়েছে। আধুরিয়া এলাকায়ই রয়েছে প্রায় ১০টির মতো দানবাক্স। যেসব পীর ও মাজারের নামে এই দানবাক্সগুলো তাদের কারোর অস্তিত্ব ছিলনা রূপগঞ্জে। অথচ সবগুলোর টাকা তোলা হয় রূপগঞ্জ থেকে।

খাদেম ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুজিবিহীন এই ধর্মীয় বাণিজ্যে বছরে আয় হয় কোটি টাকা। দৈনিক এসব দানবাক্সে ৫০ থেকে এক’শ টাকা পড়ে। যদি প্রতিদিন একেকটি দানবাক্সে ৫০ টাকা করেও পড়ে তাহলে এই চাঁদার পরিমাণ দাড়ায় প্রায় অর্ধ লাখ টাকা। প্রতিমাসে এই অঙ্ক দাড়ায় ১৫ লাখ টাকা। আর বছরে বাণিজ্য হয় ২ কোটি টাকা। যার একটি টাকাও যায় না সরকারী কোষাগারে।

আধুরিয়া এলাকার ইয়ারউদ্দিন (রঃ) দানবাক্সের খাদেম ফজলুল করিম বলেন, আমরা মাসিক বেতনে দায়িত্ব পালন করি। মাস শেষে একজন লোক এসে টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। নাম জানতে চাইলে তিনি ঐ ব্যক্তিকে চেনেন না বলে জানান তিনি।

দাউদপুর এলাকার শর্ষিণা পীর (রঃ) দানবাক্সের খাদেম গোল মোহাম্মদ বলেন, আমাগো জিগাইয়া কোন লাভ নাই। আমরা হুকুমের গোলাম।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এসব দানবাক্সের টাকা খাদেম, স্থানীয় হোমড়া-চোমড়া ও প্রশাসনই পেয়ে থাকে। নামেমাত্র কোথাও কোথাও লোক দেখানো মাজারের উন্নয়ন বা পীরের সহযোগিতা করা হয়।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনৈক খাদেম বলেন, ‌‘কি করমু বাপ। বয়স অইছে। কামাই করবার পারি না। পোলারা খাওয়ন দেয় না। হেরলাইগ্যা এই ব্যবসা দরছি। একটা কিছু কইরাতো বাচন লাগবো’।

রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিবো।

একশ্রেণির প্রতারক চক্র নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজনে প্রতারণার আশ্রয় হিসাবে বেছে নিয়েছে ধর্মের নামে এই দানবাক্স বাণিজ্য। ধর্মের নামে এই চাঁদাবাজিতে প্রতারিত হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ আর তাদের সরল বিশ্বাস। এ ব্যবসায় ‘লাভ’ বা ‘ক্ষতির’ কোন হিসাব নেই। ধর্মের নামে ব্যবসা করাই মূল পুঁজি। যা শুধুই লাভ, শুধুই বাণিজ্য। আর এ বাণিজ্যে ক্রমে ক্রমে ঝুঁকে পড়ছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র।