বুধবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

হস্তক্ষেপ বন্ধ করলেই নেপালে দূর হতে পারে ভারতবিরাধী মনোভব

news-image

ডেস্ক রিপোর্ট: গত কয়েক দিনে নেপাল থেকে নয়া দিল্লি কেবল একটার পর একটা খারাপ খবরই পেয়েছে। অথচ এই দেশটিই ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, চার বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর এই দেশেই চারবার সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

হিন্দুত্ববাদী অনুসারীদের সহজতম তত্ত্ব হচ্ছে এই যে হিন্দুবাদই ভারতীয় প্রভাব-বলয় অব্যাহত রাখতে যথেষ্ট। কিন্তু তা বারবার অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও খুব কম ভারতীয়ই বুঝতে পেরেছে যে সার্বভৌম দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যতার মূল্য খুব বেশি নেই।

ভৌগোলিক রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাটি অনেক শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধর্মীয়, ভাষাগত বা জাতিগত সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।

আর নয়া দিল্লি যদি ঘন ঘন বিরূপ অবস্থায় নিজেকে দেখে তবে তার কারণ নেপালের সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব সে উপলব্ধি করতে না পারা।

ভারতীয় সাম্রাজ্যের পতনের ৭০ বছর পর নয়া দিল্লি এখনো নিজকে ‘রাজের’ উত্তরসূরি বিবেচনা করে নেপাল ও ভুটানের মতো বাফার স্টেট হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের অংশীদার থাকা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সম্মান দাবি করছে।

অবশ্য, এই কাহিনীর আরেকটি দিকও প্রাসঙ্গিক। প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ করার নয়া দিল্লির ‘ঐশী অধিকার’ প্রত্যাখ্যান করা হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুচ্ছ বিষয়াদি নিয়ে বিবাদে মত্ত রাজনীতিবিদেরা প্রায়ই তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে আনুগত্যমূলক স্বার্থের দিকেই মনোযোগী হয়।

পরিবর্তনে অন্ধ ভারত

তবে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। প্রতিবেশীরা ক্রমাগত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠছে। বিকল্প শক্তি হিসেবে চীনের আবির্ভাবে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বিপুল গতিবেগের সঞ্চার হয়েছে।

নয়া দিল্লির অস্বস্তি বাড়িয়ে প্রতিবেশীরা দেখছে, ভারতের চেয়ে চীন পুরোপুরি ভিন্ন প্রকৃতির। চীন কারো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে (তা অভ্যন্তরীণ কিংবা পররাষ্ট্র- যাই হোক না কেন) হস্তক্ষেপ করে না। তাছাড়া তাদের হাতে আছে আকষর্ণীয় বিকল্প। তা হলো অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিপুল তহবিল। দাদাগিরি না করে স্বাগতিক দেশগুলোর হাতেই তারা বড় প্রকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেয়। আবার ভারত যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ঢিমেতালে, চীন নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করে দেয়।

নেপাল সুবিধা নিচ্ছে

নেপাল সরকার (যা কে পি ওলি ও পুষ্প কমল দহলের জোট) চীনাদের দেয়া সুবিধাটি গ্রহণ করছে।

কাঠমান্ডুতে চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের পরপরই (যাতে নরেন্দ্র মোদি অংশগ্রহণ করেছিলেন) চীনের সাথে আকর্ষণীয় চুক্তি করে নেপাল। এর ফলে চীনের সাতটি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পায় নেপাল। তৃতীয় দেশের সাথে বাণিজ্য করতে চীন তার তিয়ানজিন, শেনঝেন, লিয়ানইয়ুনগ্যাঙ ও ঝানজিয়ান উন্মুক্ত সমুদ্রবন্দর এবং ল্যানঝু, লাসা ও জিগাতশু ড্রাই পোর্ট ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছে নেপালকে।

চুক্তিটি নেপাল ও চীনের মধ্যকার ভবিষ্যতের সড়ক ও রেল সংযোগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। আর চীন যে দ্রুতগতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তাতে করে খুব শিগগিরই কানেকটিভিটি প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।

ইলেকট্রনিক ইনভয়েজ তৈরি করে নেপালি ব্যবসায়ীরা চীনা এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে। অথচ এখন ভারতীয় বন্দরগুলো ব্যবহারের সময় তাদেরকে মূল ইনভয়েজ দেখাতে হচ্ছে।

সিনিয়র নেপালি সাংবাদিক কনক মনি দিক্ষিত বলেন, ট্রানজিট প্রটোকলটির সুনির্দিষ্ট পথ নেই। এতে করে নেপাল তার অনুকূল রুটটিই ব্যবহার করতে পারবে। ফলে বলা যায়, নেপাল আর কখনো অবরোধের মুখে পড়বে না।

চীন-নেপাল প্রটোকলটি আগামী এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে নেপাল এসব বন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্য করতে চীনা এলাকা উন্মুক্ত দেখতে পাবে।

বিমসটেক সামরিক মহড়ায় নেই

ট্রানজিট চুক্তির পরপরই বিমসটেক সামরিক মহড়ায় যোগ দিতে অস্বীকার করে নেপাল। ভারতের আধিপত্য থাকা কোনো সামরিক জোটে অংশ না নিতে চাপে থাকা প্রধানমন্ত্রী ওলি ওই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন। নেপাল এর মাধ্যমে ভারতকে ইঙ্গিত দিলো যে তারা সার্কের বদলে বিমসটেক চায় না। সম্প্রতি নয়া দিল্লি সফর করে প্রচন্ডও ভারতীয় কর্মকর্তাদের জানিয়ে এসেছেন, নেপাল সার্কের অবনমন কামনা করে না।

সার্ক গঠিত হয়েছিল ১৯৮০-এর দশকে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর অজুহাতকে ব্যবহার করে সার্ককে অচল করে দিচ্ছে ভারত। পাকিস্তানের সাথে সঙ্ঘাতের জের ধরে ইসলামাদ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভারত।

নেপাল কিন্তু বিমসটেককে চায়। তবে তা কামনা করে একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়ন হিসেবে, কোনো দেশকে প্রতিরোধ করতে সামরিক বা কৌশলগত জোট হিসেবে নয়। অন্যদিকে ভারতের প্রধান লক্ষ্য বিমসটেককে সামরিক ও কৌশলগতভাবে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।

নেপাল ও বিমসটেকের অন্য সদস্যরা ভারতের এই এজেন্ডার সাথে একমত নয়। তারা তাদের নিজস্ব পন্থায় ভারতকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছে।

প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ

এখন ভারত যা করতে পারে তা হলো প্রতিবেশীদের ব্যাপারে তার আচরণ শুধরে নেয়া।

এই লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা। প্রতিবেশীদের বিষয়াদি তাদের ওপরই ছেড়ে দেয়া উচিত। চীন যেমন নাক না গলিয়ে প্রতিবেশীদের মন জয় করে নিচ্ছে, ভারতেরও উচিত সে ধরনের নীতি গ্রহণ করা। প্রতিবেশীদের মধ্যে যে ধারণাটি বিরাজ করছে তা হলো ভারত আধিপত্যবাদী, চীন নয়। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে ভারত মনে করে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি। কিন্তু অন্য দেশগুলো তা মনে করে না।

২০১৫ সালের অর্থনৈতিক অবরোধ

নেপালে ভারত এখন অজনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো মোদি সরকারের পরোক্ষ সমর্থনে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের অর্থনৈতিক অবরোধ। মদেশি তথা নেপালের ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকজন ওই অবরোধের ডাক দিয়েছিল। অবরোধের কারণে ভারতীয় পণ্য নেপালে প্রবেশ করতে পারেনি।

ওই অবরোধে নেপালি সমাজের প্রতিটি শাখা আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ২০১৫ সালের প্রথম দিকে বিপর্যয়কর ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত দুই লাখ পরিবার আরো বেশি কষ্টে পড়ে।

আর এর জের ধরেই চীনের জন্য দরজা খুলে যায। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে নেপালকে সামিল করার সুযোগটি গ্রহণ করে। তারপর চীনপন্থী কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আছে। নেপাল ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরআইয়ে যোগ দেয়।

ফলে এখন ভারতের উচিত নেপালের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকা। এমন নীতি গ্রহণ করা গেলে একপর্যায়ে নেপালের ভারতভীতি প্রশমিত হবে।

নেহরুর পঞ্চশীলায় ফিরে যাওয়া

নয়া দিল্লির নেতাদের জন্য পরামর্শ হলো নেহরুর ‘পঞ্চশীলা’ নীতি অনুসরণ করা। এতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে হস্তক্ষেপ না করার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

ভারতের ক্ষমতাসীন এলিটদের জন্য লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, যখন নেপালি নেতা তাদেরকে পঞ্চশীলা নিয়ে কথা বলেন। সম্প্রতি ভারতয়ি কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড এফেয়ার্সে বক্তৃতাকালে প্রচন্ড বলেছেন, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অবলম্বন করতে হবে। আমি খোলামেলাভাবেই বলছি, ছোট প্রতিবেশীদের কিছু স্পর্শকাতরতা আছে। এগুলো বোঝা উচিত, শ্রদ্ধা করা উচিত। খবর: সাউথ এশিয়ান মনিটর