বুধবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং ২রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ডিজিএফআই আমাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল: এস কে সিনহা

news-image

ডেস্ক রিপোর্ট: সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর হুমকির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার ও বন্ধুদের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই থেকে হুমকি দেওয়ার পর আমি বিদেশ থেকেই পদত্যাগপত্র জমা দেই।’ তার লিখিত ‘এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ বইয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে ডিজিএফআই-এর পিআরএমসি বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তানভীর মাজহার সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও ব্যক্তিকে এ ধরনের থ্রেট বা হুমকি দেওয়া আমাদের কাজ নয়। এটা আমরা কখনও করি না।’

রবিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ক্রেতাদের সামনে ‘এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ হাজির করেছে। ওই বইটির একাংশ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করেছে অ্যামাজন। বইতে সিনহা দাবি করেছেন, ২০১৭ সালে দেওয়া সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের কারণেই বর্তমান সরকার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। ওই রায়ের মাধ্যমে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে যাওয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। প্রকাশিত বইতে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কথাও লিখেছেন তিনি।

সিনহার মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিএফআই-এর পিআরএমসি বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তানভীর মাজহার সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বইটি এখনও পড়িনি। সেটা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। কোনও মন্তব্য দেওয়ার আগে বইটি পড়ে মন্তব্য দেওয়াটা ভালো। তবে সংস্থার পক্ষ থেকে এটা বলতে পারি যে, কোনও ব্যক্তিকে এ ধরনের থ্রেট বা হুমকি দেওয়া আমাদের কাজ নয়। এটা আমরা কখনও করিও না। তারপরও বইটা পড়লে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে যে তিনি কোন প্রেক্ষাপটে, কাদের কথা বলেছেন। কী লেখার চেষ্টা করেছেন।’

অ্যামাজান তাদের ওয়েবসাইটে বইটির ভূমিকাসহ প্রথম ১০ অধ্যায় সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে। বইয়ের ভূমিকায় সিনহা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় তার সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও প্রতিবন্ধকতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, বিচারিক সেবা ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে মূল্যবোধ্যের অবক্ষয়; শৈশবে থাকা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ, বিভিন্ন বিষয়ে বিচারিক মনোভাব; আইনজীবীদের ওপর চাপ; পুলিশকে ব্যবহার; জরুরি অবস্থার প্রভাব ও ব্যবসায়ীদের টাকা নিয়ে ডিজিএফআইয়ের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেছেন।

সিনহা তার বইতে লিখেছেন, সংসদের বিরুদ্ধে কথা বলায় প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও তার দলের সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তিনি লিখেছেন, ‘আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরাও আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনতে থাকে। আমি আমার সরকারি বাসভবনে ছিলাম। আইনজীবী ও বিচারপতিরাও আমার সঙ্গে দেখা করতে পারছিলেন না। সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানানো হয়, আমি অসুস্থ। সে কারণে ছুটির আবেদন করেছি। কয়েকজন মন্ত্রী বলছিলেন যে, আমি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেবো।’ বইয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগসহ নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে।’ তিনি লিখেছেন, ‘২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই। আমি আমার বক্তব্য বলি যে আমি চিরতরে দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছি না। আমি আশা করছিলাম যে, আদালতে আমার অনুপস্থিতির বিষয় ও ছুটির কারণে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হবে এবং সবাই ঠিক বুঝতে পারবেন; সরকার হয়তো এই রায়ের অপরিহার্যতা বুঝতে পারবে। তারা হয়তো বুঝবে যে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র ও দেশের জন্য কতটা প্রয়োজন। আমার পরিবার ও বন্ধুদের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই থেকেও হুমকি দেওয়ার পর আমি বিদেশ থেকেই পদত্যাগপত্র জমা দেই।’

বইটিতে নিজের শৈশব ও জীবনসংগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন এস কে সিনহা। সাবেক এই প্রধান বিচারপতি তুলে ধরেছেন কীভাবে তিনি বিচারিক বেঞ্চে যুক্ত হন। আপিল বিভাগের বাস্তবতা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। বইতে বিচার বিভাগে নিজের সংযুক্তি এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনে তার ভূমিকার কথাও লিখেছেন সিনহা। বিভিন্ন দাতব্য কাজে অংশগ্রহণ ও প্রধান বিচারপতি হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার ইতিহাস ও প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিজের দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছেন বইটিতে। কথা বলেছেন বাংলাদেশে মামলার জটিলতা ও দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে।

নিজের বইয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নিয়ে কথা বলেছেন এস কে সিনহা। জরুরি অবস্থার সময় নিজের অবস্থান নিয়ে এস কে সিনহা বলেন, ‘জরুরি অবস্থার সময়ে আমাকে ডেকেছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। তিনি আমাকে পদত্যাগের অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু আমি রাজি হইনি। ওই সময় তার সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আমিনুল করিমও উপস্থিত ছিলেন।’ জরুরি অবস্থা ডাকার পর দেশের অবস্থা কী হবে, তা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বলে বইতে দাবি করেন এস কে সিনহা। তার দাবি, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তিনি জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘তৎকালীন প্রধান বিচারপতির স্ত্রী মারা গেলে তারা সবাই তাকে সমবেদনা জানাতে যান।

সেখানেই দেখা হয় সুরঞ্জিতের সঙ্গে। তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে নিজের আনন্দ প্রকাশ করেন সুরঞ্জিত। বলতে থাকেন, নির্বাচনে জয়লাভ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসায় খুবই খুশি তিনি। সিনহা লিখেছেন, ‘তখন বলেছিলাম, আপনারা ভুল করছেন। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় এনে দেশের ক্ষতি হবে। আর এর প্রথম প্রভাব পড়বে আওয়ামী লীগের ওপর। এরপর আমি তাকে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলে চিন্তিত হয়ে পড়েন সুরঞ্জিত। যাওয়ার সময় তিনি বলেন, দেখা যাক।’

বইতে প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিমকে নিয়েও কথা বলেন সিনহা। তিনি বলেন, ‘মাত্র দুইমাসের জন্য দায়িত্বে ছিলেন মো. তোফাজ্জেল ইসলাম। আর তার একমাত্র কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকার্যের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। তারপরই প্রধান বিচারপতি হন ফজলুল করিম।’

বইতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনে নিজের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন সিনহা। তিনি লিখেছেন, ‘শফিক আহমেদ, বিচারপতি আব্দুর রশীদ ও আমি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলাম। আমি রানা দাস গুপ্তকে যুক্ত করার সুপারিশ করি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মনোনয়ন করা হয় মোহাম্মদ নাজমুল হককে। সবাই এটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। ভেবেছিল নাজমুল হকের অভিজ্ঞতা এই বিচারকার্য সম্পাদনে জোরালো ভূমিকা রাখবে। কিন্তু ফল আসে নেতিবাচক। তিনি একবছরেও একটি মামলা সম্পাদন করতে পারছিলেন না। তিনি আমাকে সবসময়ই বলতেন তাকে যেন প্রধান বিচারপতির পদের জন্য সুপারিশ করা হয়। এরপর আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

সিনহা লিখেছেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও সেটা ছিল নামে মাত্র। সব সিদ্ধান্তই আসতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। সেটা বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যেই সরকারই হোক না কেন। শফিক আহমেদ তখন আমাকে বলেন আমি যেন প্রধানমন্ত্রীকে বলে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলি। আমি সে বিষয়ে কথা বলতে চাইনি। কারণ নির্বাহী বিচারক হিসেবে মামলার বিষয়ে আমার কারও সঙ্গে কথা বলা ঠিক নয়।’

সিনহা লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের কথা চিন্তা করে তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে রাজি হন। বিচারক হিসেবে নয় একজন নাগরিক হিসেবে তার এটা দায়িত্ব ছিলে বলে মনে করেন তিনি। সাবেক প্রধান বিচারপতি জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর তিনি মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। একটা সময় আবেগীও হয়ে পড়েন। তিনি অনেক কথা বলেন। একটা সময় সিনহা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আগে ট্রাইব্যুনালের গঠন সঠিক ছিল না, সেখানে অনেক ভুল ছিল। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করবেন। এর ১৫ দিনের মাঝে তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন বলে সিনহা তার বইয়ে উল্লেখ করেন। বাংলা ট্রিবিউন