বুধবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং ২রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

চলচ্চিত্রে ক্ষুদিরাম

news-image
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। স্বাধিকার আন্দোলনের এই কীর্তিমান বিপ্লবীকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন পরিচালক দেওয়ান নাজমুল। তিনি ইতোপূর্বে সীমরেখা নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য যাই পাক না কেন, তার নির্মাণশৈলীর মুন্সিয়ানায় আদৃত ছবিটি সর্বজন প্রশংসিত হয়েছে। এরপর তিনি নির্মাণ করেন নাকফুল। সেটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
একইসঙ্গে তিনি বর্তমানে নির্মাণ করছেন সুয়োরাণী দুয়োরাণী নামে একটি হাজার পর্বের টিভি ধারাবাহিক। পাশাপাশি নির্মাণ করছেন ক্ষুদিরাম। লক্ষ্য করার বিষয় হলো বাংলা সংস্কৃতির আদি থেকে ইতিহাসের পাতায় পদচারণার মধ্য দিয়ে তিনি একটা শৈল্পিক চেতনাবোধে উপনীত হতে চাইছেন।

দেওয়ান নাজমুল বলেন, এই ছবিটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমি একটা আত্মোপলব্ধিতে পৌঁছার চেষ্টা করছি। আমার যারা অগ্রজ রয়েছেন তারাও এমন ছবি নির্মাণ করেছেন। খান আতাউর রহমান নির্মাণ করেছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ডায়মন্ড ভাই বানিয়েছেন নাচোলের রাণী, আমজাদ ভাই বানিয়েছেন কাল সকালে, জহির রায়হান বানিয়েছেন জীবন থেকে নেয়া। আমি তাদের পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চাই।

তিনি বলেন, ইতিহাস নিয়ে কাজ করার মজাই আলাদা। কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে কাজ করতে হলে সেই অতীত সময়ের কাছে যেতে হয়। এই ছবিতে আমি চেষ্টা করেছি সেই সময়কে প্রতিফলিত করতে এবং কাজটা করতে গিয়ে বেশ আনন্দ পেয়েছি। 

তিনি বলেন, আমি ক্ষুদিরাম চরিত্রে একটি নতুন ছেলেকে নিয়েছি। তার নাম প্রিন্স। অসাধারণ অভিনয় করেছে সে। রুনা খান, শহিদুজ্জামান সেলিম, মাসুম আজিজ, তৌফিক, বড়দা মিঠ, মিথিলা মিলন এবং শান্তরাও ভাল কাজ করেছে। তাদের কাজে আমি সন্তুষ্ট। গল্পের আখ্যান ভাগে স্থান পেয়েছে ক্ষুদিরামের পুরো জীবন। চিত্রনাট্য বুননের ঘটনাবলি এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ক্ষুদিরামের জীবন-কথা। ক্ষুদিরাম বসু ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলা শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোল প্রদেশের শহরে আয় এজেন্ট। তার মা লীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অপর পূত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে তিন মুঠো খুদের (শস্যের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। ক্ষুদিরাম বসু বড় বোনের কাছেই বেড়ে উঠেন।

পরিণত জীবনে পৌঁছানোর আগেই ক্ষুদিরাম ছিলেন একজন ডানপিটে, বাউ-ুলে, রোমাঞ্চপ্রিয় কিশোর। ১৯০২-০৩ সালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সঙ্গে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অম্রিতার সঙ্গে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। এখানকার হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে তিনি শিালাভ করেন।

মেদিনীপুরে তার বিপ্লবী জীবনের অভিষেক হয়। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তারই নির্দেশে সোনার বাংলা শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ সালে কাসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান।
ক্ষুদিরাম বসু তার শিক সত্যেন্দ্রনাথ বোসের কাছ থেকে এবং ভগবত পড়ে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন। তিনি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতে রাখেন এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের হত্যার চেষ্টা করেন। একের পর এক বোমা হামলার দায়ে ৩ বছর পর তাকে আটক করা হয়। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাতে সাড়ে আটটায় ইউরোপিয়ান কাবের সামনে বোমা ছুঁড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। বিচারক ছিলেন জনৈক ব্রিটিশ মি. কর্নডফ এবং দুইজন ভারতীয়- লাথুনিপ্রসাদ ও জানকিপ্রসাদ। বিচারে তাকে ফাঁসি দ-ে দ-িত হয় এবং তার ফাঁসি কার্যকর হয় ১৯০৮ সারে ১১ আগস্ট। 

রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা? ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। ফাঁসির মঞ্চ উঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ক্ষুদিরামকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা লিখেছিলেন এবং অনেক গানও তখন রচিত হয়েছিল। যেমন, একবার বিদায় দে মা। তার মৃত্যুর পর ব্রিটিশদের খুন করার জন্য তরুণরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। 

ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে ক্ষুদিরামের সহজ প্রবৃত্তি ছিল প্রাণনাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করার। তার স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিল সৎসাহস। আর তার ছিল অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিল না বৃথা আস্ফালনেও ছিল না; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

দেওয়ান নাজমুল বলেন, আমি ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করেছি। আশা করি ছবিটি দর্শকের ভালো লাগবে। ক্ষুদিরামের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ রচনা করেছেন পরিচালক নিজেই। তিনি জানান, ক্ষুদিরাম ছবিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হবে। তার মধ্যে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবও রয়েছে। 

ছবিটির চিত্রগ্রহণ করেছেন আরাফাত হোসেন এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আলী আশরাফ।