মঙ্গলবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সাকিনও দেশের সেবা করতে চায়

মুনশি আলিম : মূল নাম এ এ মুহতারাম সাকিন। তবে সাকিন নামেই সে বিশেষ পরিচিত। জন্ম ১৯৯৫ সালের ১৮ নভেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেড্ডার নুর মঞ্জিলে। জন্মের সময় মোদকবাড়ি তথা নুর মঞ্জিল ছিল উল্লাসে মুখরিত। প্রকৃতির কোলজুড়েও ছিল আনন্দের ফল্গুধারা। জন্মের পর আর দশজন শিশুর মতোই সে ছিল ফুটফুটে। রঙিন স্বপ্ন দোল খেত তার চোখেমুখে। চিত্তাকর্ষক হাসিতে জুড়িয়ে যেত তৃষিত মা-বাবার প্রাণ। সমাজের আর দশজন শিশুর মতোই সেও চেয়েছিল বেড়ে উঠতে কিন্তু প্রকৃতি বাধসাধে! জন্মগতভাবে সিপি রোগে আক্রান্ত সাকিন। কিন্তু এই সমস্যাটির কথা শুরুতে তার মা-বাবা বুঝতে পারেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাকিনের মা-বাবা তার এই সমস্যাটি বুঝতে পারে। সিপি বা সেরিব্রাল পালসির কারণে সাকিন শিশুবয়স থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে হাঁটতে পারে না হুইলচেয়ারে চলাচল করে।

বিষ্নতা আর হতাশায় মুষড়ে পড়ল পুরো পরিবার। বাবা মাকসুদ আলী মির্দা এবং মা ফরিদুন্নাহার হতাশ হলেন কিন্তু হাল ছাড়লেন না। রোগগ্রস্ত সাকিনকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করলেন। মা ফরিদুন্নাহার ছেড়ে দিলেন নিজের চাকরি, ছেড়ে দিলেন প্রাইভেট ব্যাচ। ছেলেকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে শুরু করলেন নতুন উদ্যম।

ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করলেন। স্কুলের শিক্ষকরা অবশ্য প্রথমে তাকে ভর্তি করতে চায়নি। অন্যসবার মতো ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই শিক্ষকম-লীরা তাকে ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন। অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে শিশুশ্রেণিতে পড়ার সময় তার পরিবারের উদ্যোগে টেবিল-চেয়ার তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। মা ফরিদুন্নাহারই তার প্রথম শিক্ষক। মায়ের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার কারণেই সাকিন নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার জন্য উঠেপড়ে লাগল। শুরু হলো জীবনযুদ্ধের অন্যরকম এক ইতিহাস।

সাকিন ছিল পাঠে খুবই মনোযোগী। আর দশজন স্বাভাবিক ছেলেমেয়েদের চেয়েও পাঠে তার বেশি মনোনিবেশ ছিল। পরীক্ষার আগে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড থেকে বৈধভাবে শ্রুতি লেখক নিয়োগের জন্য তার পরিবার থেকে আবেদন করা হয়। এবং পরবর্তীতে তা গৃহীতও হয়। সাকিন তার হাত দিয়ে লেখালেখিও করতে পারে। তবে হাতের লেখার গতি তুলনামূলক খুবই কম। আর এ কারণেই সাকিন কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড থেকে অনুমতি নিয়ে অষ্টমশ্রেণি পড়–য়া ছাব্বির আহমদকে ওর শ্রুতিলেখক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

আত্মপ্রত্যয়, উদ্যম আর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে নিজের ভাগ্যকে বদলানো যায়, তা এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিল সাকিন। তৎকালীন ওই স্কুলের বাণিজ্যবিভাগের মধ্যে তার রেজাল্টই ছিল চোখে পড়ার মতো।

নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করা এক সংগ্রামমুখর তরুণের নাম সাকিন। এই রেজাল্টের পরপরই সমস্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। এটিএন চ্যানেল তাকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করল। স্থানীয় পত্রিকায়ও নিউজ হলো। ফলে সাকিনের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। বেড়ে গেল তার দায়বোধ। বাণিজ্যবিভাগ নিয়ে এইচএসসিতে ভর্তি হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে। ফাইনাল পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো দশমশ্রেণি পড়–য়া নোয়াজ্জেস ভুইয়াকে। মা-বাবার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এইচএসসিতেও সে এ প্লাস পেল। নিজের প্রতি সাকিনের আত্মবিশাস ক্রমশই বেড়ে যেতে লাগল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হলেও পারিবারিক লোকবল ও যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে তা আর সম্ভব হলো না। পরবর্তীতে অ্যাকাউন্টিংয়ে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে। নিজের প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করল। শুরু করল টিউশনি। কথা বলার ধরন ও উপস্থাপন ভালো হওয়ার কারণে ক্রমশই তার জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। বাড়তে লাগল স্টুডেন্টের সংখ্যাও।

মা ফরিদুন্নাহার প্রাইভেট ব্যাচ কমানোর জন্য চাপ দিলেন; যাতে করে সে অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়। এত কিছুর পরেও সাকিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলো। স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় তার সহপাঠীরা তাকে খুবই সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে নিচতলা থেকে হুইলচেয়ারে করে চারতলাতে উঠানো নামানোতে প্রতিদিনই তারা সহযোগিতা করত। এজন্য সে তাদের কাছেও কৃতজ্ঞত।

দুই ভাইবোনের মধ্যে সাকিনই ছোটো। বড়ো বোন জিন্নুরাইন লাবণী ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ কুমিল্লা থেকে এমবিবিএস পাস করে বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজে ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তার বোনের স্বামী ডা. মঞ্জুরুল ইসলাম খাদেমও একই মেডিকেল কলেজে শিশুভিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। পিতা মাকসুদ আলী মির্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনেসট্রেশন থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেছেন। মা ফরিদুন্নাহার ইডেন মহিলা কলেজে পড়াশোনা করেছেন বাংলা নিয়ে।

সাকিন পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প এবং উপন্যাস পড়তে বেশি আগ্রহবোধ করে। বিশেষ করে ড. জাফর ইকবাল এবং হুমায়ুন আহমদের লেখনীর দারুণ ভক্ত সে! লালসবুজের দেশে সবুজ রঙই তার বেশি পছন্দ। সাধারণ বাঙালিদের মতোই তার প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত-মাছ।

সুবর্ণ নাগরিক সংস্থা থেকে সাকিনকে সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী নিবন্ধন করানো হয়েছে। তবে সে কারও করুণা নিয়ে বাঁচতে চায় না। নিজের যোগ্যতাবলে কোনো কর্ম করেই বাঁচতে চায়। সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে অবদান রাখতে চায় দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে। আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চায়। ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। বিসিএস’ই তার প্রথম টার্গেট। বিশেষ করে অ্যাডমিন ক্যাডার। এ ব্যাপারে সরকারের একটু সুদৃষ্টিই হতে পারে সাকিনের স্বপ্ন পূরণের পরম পাথেয়।