বুধবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ৩০শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

“স্মৃতিতে অম্লান একটি ধূসর দিন” একটি শিক্ষানীয় ঘটনা সবাই একবার হলেও পড়ে দেখুন

news-image

ভাই সাহেব (বড় ভাই) প্রতিরাতে কাজের শেষে বাড়ি ফিরার সময়, ঠোঙ্গায় করে কিছু চাল নিয়ে আসেন। সেই চালে মা মাটির চুলায় লাকড়ির আগুনে গভীর রাত পর্যন্ত রান্না করেন। আমরা পাতিলার দিকে চাতক পাখীর মতো এক দৃষ্টে তাকিয়ে চুলার পাড়ে গোল হয়ে বসে থাকি যেন সাত রাজার ধন পাহাড়া দিচ্ছি। চুলার লাকড়ি জ্বলতে না চাইলে আমরা নয় মুখে একসাথে ফুঁ দিতে থাকতাম। ধোঁয়ায় আমাদের চোখ লাল হয়ে যেতো। দম নিতে পারতাম না। কাশি আসতো, ভুকা পেটে কাশতেও পারতাম না। কখনো শাকপাতা, ভর্তা ভার্তি কখনো পিঁয়াজ মরিচ, কখনো আর কিছু না থাকলে লবন দিয়ে পানিতে কচলাইয়া কুপি বাতির আলোতে আমরা নয়টি ভুখা মুখ খেতে বসতাম।

স্বাদের ধার ধারিনা ক্ষুধা নিবারণের জন্য উদর পূর্তি করি। সেই ভাতের কিছু অবশিষ্ট থাকলে, তা পানি দিয়ে রাখা হতো, পরের দিন সকালের নাস্তার জন্য। তবে ববেশীর ভাগ সময়েই অবশিষ্ট কিছু থাকতো না। ফলে নাস্তা আমাদের কপালে খুব কমই জুটতো। আর দুপুরের খাবার বলে যে কিছু আছে বহুদিন না খাওয়ায়, আমরা যেন তা ভুলেই গিয়েছিলাম। কখনো কখনো কোন তরকারীর বেওত করতে না পারলে জাউ রান্না হতো। সেই জাউ ক্ষুধার তোড়ে অমৃতের মতো হাপুত হুপুত করে খেতাম। বলে রাখি ভাই সাহেব ইন্টারে পড়ার সময় বাবা অসুস্থ হন ডাকাতের মার খেয়ে। পরে দীর্ঘ রোগ ভোগে তিন বছর পর বাবা মারা যান। সংসারের বড় সন্তান হিসেবে আমাদের আহার জোগাড় করতে তিনি পড়া শোনা ছেড়ে বাবুর হাটে (শেখের চর বাজার) এক কাপড়ের দোকানে কাজ নেন। কাজ বলতে হিসেব রাখা, পাকা খাতা লেখা। ঐ সময় ঐ কাজটিকে সরকারী করা বলতো। ভাই সাহেব বেশী উপার্জনের জন্য শুধু সরকারীতেই সীমাবদ্ধ না থেকে কাপড়ের গাঁট বাঁধা, কাপড় যানবাহনে তুলে দেওয়ার অর্থাৎ খাস করে বললে, কুলিগীরিটাও করতেন। মালিক ওনাকে দুপুরে খাবারের টাকা দিলে বাহির থেকে ঘুর ঘার করে, না খেয়েই টাকাটা পকেটে রেখে চলে আসতেন। কখনো কখনো হাট বারের বাইরের দিন গুলোতে মালিকের সঙ্গে, ঢাকায় ইসলামপুরে দোকানের জন্য মাল কিনতে যেতেন। কখনো কখনো মালিকের বাড়ির ফুট ফরমায়েশ খাটতেন। আবার কখনো কখনো দোকানের বাকীর টাকা তুলতে বা তাগাদা দিতে ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, পাবনা সহ কতো জায়গায় যেতেন! এ সবই করতেন আমাদের খাবার জোগার করতে।

একদিন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত গভীর হয়, ভাই সাহেব চাল ডাল নিয়ে ফিরেন না। মা একবার ঘরে আসেন, আরেকবার রাস্তায় যান। পথের পানে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। কোন পথচারী চেনা লোক পেলে, খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেন। কোন সদুত্তর না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরে আমাদের উপবাসী মুখ দেখেন আর নীরবে অশ্রুপাত করেন। গভীর রাত অবধি জেগে থাকার পর মা বললেন, “ তোরা বেশী করে পানি খা। খাইয়া হুইয়া পড়।” আমরা তাই করি। কিন্তু খালি পেটে কতো আর পানি খাওয়া যায়! উটকী (বমি) আসে। ক্ষুধা পেটে ঘুম আর আসেনা। মা, ছেলের চিন্তায়, কি আমাদের আহারের চিন্তায়, সারারাত ছটফট করেন। পরদিন আধা বেলা পার হয়ে যায় তবুও ভাই সাহেব বাড়ি ফিরেন না। বড়রা যেমন তেমন আমি আর আমার ছোট ভাই চোখ্যে আন্ধাইর দেহি। তাওড়াইয়া পইড়া যাই। হাঁটতে পারিনা। আমাদের তখন আর কতই বা বয়স! আমার বড়জোর আট আর ওর ছয়। আমরা না খাওয়া প্রায় দেড় দিন এক রাত। মা এসে বললেন, “ তোরাতো আজাইড়াওই। বাইতে গিলুম গিলুম না কইরা, তোর ফুপুরে দেইখ্যা আয়গা।” ফুপুর বাড়ি আমাদের বাড়ি থেক দেড় দুই মাইল দূরে রেল লাইনের হেই পারে পাঁচভাগ গ্রামে। ছোড ভাই কয়, হুদাহুদি মায় আমগরে ফুপুরে দেখতে যাইতে কয় কেন, ফুপুর কি অইছে?

আমি ওই বয়সেই প্রশ্নটির উত্তর জানতাম, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলাম না। সত্যি বলছি, চারটা ভাতের আশায় আমি না খেয়ে মরে গেলেও যেতাম না। কিন্তু ছোট ভাইটির শুকনা আর ভুখা কালো মুখের দিকে তাকিয়ে না গিয়ে পারিনি। ফুপুর স্বামী নেই। একমাত্র ফুফাত বোনকে নিয়ে ওনার সংসার। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া ফুফাতো বোনটি স্কুলে চলে গিয়ছিল। ফুপুর সেদিন শরীরটা ভালো ছিলনা। তিনি শুয়ে আছেন। আমাদের আওয়াজ পেয়ে বললেন, আমার বাবারা আইছো! মায় কিমুন আছে? আমারদ শইলডা ভালানা। মাইয়াডায়ও ইশকুলে গেছেগা। তোঙ্গরে কি খাইতে দেই! ঘরদ কিছু নাই। যাও উডানে খেলাধুলা করোগা। আমরা হাঁটতেই পারিনা, কি আর খেলা ধুলা করবো! দুপুর পার করে কই, “ফুপু এইবার যাই! “ ফুপু শুয়ে থেকেই বললেন, “ যাও সোনারা। কিছু খাইতে দিতে পারলাম না। আরেক দিন আইও। ”

আমরা রোদের মধ্য দিয়ে দু’ভাই গলাগলি করে ফিরছি। জিনারদী বাজারে এসে রেইল গাড়ির জন্য লাইন পার হতে পারছিনা। স্টেশনের ওপাশে বাজারের ধারে দাঁড়িয়ে আছি, ট্রেইন চলে যাবার অপেক্ষায়। পাশেই সুশিল ময়রার দোকান। ওখানে নিমকি, কডকডি, মুড়ালী ভাজা হচ্ছে। গরম তেলের ভাজা গন্ধ মৃতপ্রায় ক্ষুধাটা জাগান দিয়ে তুলল। ছোট ভাই মিনমিনিয়ে বলল, ভাই! দেখ, কিমুন গরম ভাজা জিনিশ গুলা। খুব মজা অইব না? আমি চুপ করে থাকলাম। মনে মনে ভাবলাম, দুইডা নিমকি আমার জইন্যে না, ভাইডারে যুদি কেউই দিত, তয় মুহে দেওয়াইয়া পানি খাওয়াইলে ক্ষুধাডা কমতো। পাশেই হলুদ বিল্ডিংটা চোখে পড়লো। ওখানে এক সময় কতো আসতাম! একপাশে পার্টিশন করা বাবার ডিসপেনসারি ও চেম্বার। আরেক পাশে আমাদের রেশন শপ ছিল। ওখানে কয়াল বড় পাল্লায় চাল, গম, আটা মাপত লারে লাপ এক, লারে লাপ দুই,,,

ডাক্তারের ছেলে বলে রোগিরাও খাতির করে কতো কি কিনে দিতে চাইতো, বাবা নিতে দিতেন না। পাশের ঘোষের দোকানে বসিয়ে সুরা দেওয়া খিরমন, লালমন, রসগোল্লা আরো কতোকি খাওয়াতেন আবার বাড়ি আনার জন্য কিনে কর্মচারী দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন! ওই বিল্ডিংটাতে এখন অন্যদের মুদি দোকান। সেই ডাক্তরের পুতই আমরা দু’জন, দু’দিনের ভুখা শিশু অথচ আজ আমাদের খোঁজ কেউ রাখছেনা। কেউ কি নেই ছোট্ট হাটতিতে একটি নিমকি দিয়ে বলবে, নেও ধরো। তুমি ডাক্তরের ছুডু পুত না!… বিকেলে যখন বাড়ি ফিরি, আমাদের মুখ দেখে মা বুঝতে পারেন, যে উদ্দেশ্যে আমাদের ফুপুর বাড়ি পাঠিয়েছিলেন, তা পূরণ হয়নি। তিনি শুধু আমাদের জড়িয়ে ধরে অঝোড়ে কেঁদেছিলেন। বিষয়টি ছিল এমন যে, ভাই সাহেবকে ওনার মালিক হঠাৎ করেই তাগাদার কাজে মানিকগঞ্জ পাঠান অবেলায়। ভাই সাহেব বাচ্চু নামের একজনকে টাকা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলে যান। কিন্তু বাচ্চু টাকাটা সময় মতো পৌঁছায় নি। এতে তারও দোষ ছিলনা। কারণ, সেতো আর জানতো না, ঐ টাকায় চাল ডাল না কিনলে একটি পরিবার উপোস করবে। সব দোষ কপালের। রাতে যখন আমার ভাই চাল ডাল নিয়ে আসলেন, তখন বাচ্চুও টাকা নিয়ে আসে। আমার ভাই বাচ্চুকে শুধু বলেন, বাচ্চু তোমার গাফিলতিতে একটি পরিবার দু’দিন উপাস। বাচ্চু সব জেনে সেদিন অনেক কেঁদেছিল।