রবিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কেমন হবে কবরের প্রথম রাতটি? আসুন না একটু ভাবি…

news-image

আমি বুঝমান হওয়ার পর আমার খুব কাছের আত্মীয় মারা গেছেন আমার দাদী। বছর চারেক আগে। আমি যখন ইবতিদায়ী পঞ্চমে পড়ি তখন মারা গেছেন আমার দাদা। প্রায় বিশ বছর হতে চললো। আমার নানা মারা গেছেন আমার বয়স যখন দুই বছর চলে তখন। নানী প্রায় এক শতাব্দি ধরে বেঁচে আছেন আলহামদুলিল্লাহ। মা ও বাবার পরিবারের চার সিনিয়রের ফিরস্তি দিলাম। এর পরের প্রজন্মের খুব কাছের কেউ আর মারা যাননি।

নানা মৌলভী মানুষ ছিলেন। বিশাল দাড়ি, লম্বা পাঞ্জাবি পরতেন। একটা ছবি দেখেছি মাত্র। নানার সাথে আর কোনো স্মৃতি মনে নেই। থাকার কথাও না। কিন্তু দাদা আর দাদীর কথা স্পষ্টই মনে আছে। দাদার মারা গেছেন নিরানব্বই সালে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলাম আমার মেঝো মামার কাছে। দাদী কয়েকবছর আগে মারা যাওয়ায় নিজে উপস্থিত থেকে জানাযা পড়িয়ে নিজ হাতে মাটি দিয়েছি। তার স্মৃতিগুলো বেশ তরতাজা।

এত কথা লিখছি কেনো? হ্যা, কারণ তো একটা আছেই। আর তা হলো, উনারা এখন কেমন আছেন কবরে? নানার কবর ঢাকাতেই। দাদার কবরটা বাড়ির পেছনে এক জঙ্গলে পারিবারিক কবরস্থানে। দাদীরটা বাড়ির সামনে পারিবারিক কবরস্থানে। কেমন আছেন তারা মাটির নিচে? আল্লাহ কেমন আচরণ করছেন তাদের সাথে? তারা কি কবরের প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পেরেছিলেন? নাকি পারেন নি? আশা করি পেরেছিলেন। কিন্তু যদি না পেরে থাকেন? কেমন আছেন তারা?তাদের পরিবার ছিলো বিশাল। ছেলে-মেয়ে, নাতি নাতনীসহ বহু আত্মীয়স্বজন দিয়ে ভরা ছিলো তাদের জীবন। টাকাপয়সা, জমিজমা কোনো কিছুর কমতি ছিলো না তাদের। কিন্তু তাদের সাথে এখন কী আছে? তাদের সন্তানরা, আত্মীয়স্বজনরা তাদের জন্য কী করছেন? এমন কিছু কি করছেন যার কারণে তারা কবরে ভালো থাকবেন? জানি না।

তারা তাদের সারাটা জীবন এই সন্তানদের মানুষ করা, সম্পদ অর্জন করে সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। সাথে কিছু কি নিয়ে গেছেন? সন্তানদের কি নামাযী বানিয়ে রেখে যেতে পেরেছেন? পারলে তার প্রতিদান পাচ্ছেন আর না পারলে তারও প্রতিদান পাচ্ছেন। কয়েক টুকরা কাফনের কাপড় ছাড়া কিছুই নিয়ে যেতে পারেন নি। সেই কাফনও আজ হয়তো পচেগলে মাটির সাথে মিশে গেছে। তাদের হাড্ডিগুলোও হয়তো পোকামাকড় খেয়ে ফেলেছে। জানি না তারা কেমন আছেন? তাদের আত্মাগুলো কি সিজ্জীনে নাকি ইল্লীনে আছে জানি না।

আজ আমার মা-বাবাও বয়োবৃদ্ধ। খালা-মামা, চাচা-ফুফু সবারই মধ্যবয়স অতিক্রম করেছেন। কেউ কেউ নিজেরাই এখন নানা-নানী বা দাদা-দাদী হয়েছেন। সব আছে তাদের। কিন্তু তারাও একদিন থাকবেন না।আমরা যারা তৃতীয় প্রজন্মের আছি, বয়স এখনো চল্লিশ ক্রস করেনি তারা মনে করছি আরো অনেক দিন বাঁচবো। এর মধ্যেই মৃত্যু নিয়ে ভাবার কী আছে? আর কটা দিন যাক না, তারপরই সলাত পড়া শুরু করি, গ্লামারটা শেষ হোক তারপরও না হয় বোরকা-হিজাব পরবো, বয়স এখনো ষাট পেরোয়নি এর মধ্যেই হজ্জ কিসের!

কেউ জানে না কার ডাক কখন আসবে। সবাইকে সব রেখে চলে যেতে হবে। নিজের আমল আর কাফনই হবে সাথী। কাফন পচে নষ্ট হয়ে যাবে। বাকী থাকবে আমল। আমার দাদা-দাদী, নানারাও আমাদের মত বয়সে ছিলেন। আজ তারা ইতিহাস। কেউ তাদের তেমন মনেও করি না। তারা হয়তো আমাদের দিকে চেয়ে আছেন, তাদের জন্য একটু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবো, একটু দান-সাদাকা করবো। কিন্তু আমরা কি করছি?

আমরা দুনিয়া নিয়ে পড়ে আছি অথচ মৃত্যু আমার বালিশের কাছেই হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে। দুনিয়ার মোহ আমাদের অন্ধ করে দিয়েছে। দুনিয়ার ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে আমরা মৃত্যুর পরের কঠিন জীবনকে ভুলে গেছি। আমরা ভুলে গেছি যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে চলে গেছেন আমাদেরকেও আজ কিংবা কাল সেভাবে চলে যেতে হবে। প্রস্তুতি আছে তো?