মঙ্গলবার, ১৮ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং ৪ঠা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আমরা নির্বাচন বয়কট করবো না : ড. কামাল

news-image

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করা হবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন।শনিবার (১৭ নভেম্বর) বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘এ সরকারের আমলে বিচার বিভাগের ওপর আঘাত এসেছে, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে, নিম্ন আদালতের দায়িত্ব পালন অসম্ভব করে দেওয়া হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেওয়া নিয়ে শাস্তি পেতে হয়েছে। সাতজন বিচারপতি ওই রায়ের স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু একজনকে শাস্তি পেতে হলো।

’কামাল হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন ছাড়াই ১৫৪ জনকে সংসদ সদস্য করা হয়েছে। এ নিয়ে আবার গেজেট প্রকাশ করাও হয়েছে। আমি মনে করি এই গেজেট করে তারা প্রেসের কাগজ নষ্ট করেছে।’তিনি বলেন, ‘ওরা যতই দশনম্বরি করুক আমরা সকলে ভোট দিতে যাবো। হাজার হাজার মানুষ ভোট দিতে যাবে। দেশের সকল ভোটারকে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। কেউ যাতে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রার্থী না হয়, টাকা দিয়ে ভোট কিনে মেম্বার হয়েছে কিনা, তা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিহত করতে হবে। আমাদের জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে আমরাই সকল ক্ষমতার উৎস, আমরাই দেশের প্রকৃত মালিক।’

জাতীয় ঐক্যফন্টের এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, ‘এবার নির্বাচনে দুই কোটি তরুণ ভোটার। এরাই দেশের মালিক। নির্বাচনকে ঘিরে গুণ্ডাপাণ্ডা থাকবে, তবু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে ঘরে মানুষকে গিয়ে বোঝাতে হবে।’উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে ড. কামাল বলেন, ‘আপনারা এই অনুষ্ঠান শেষে জেলার আইনজীবীর সমিতিগুলোকে এই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। কারণ, সময় খুবই কম। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেওয়ার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও পাঁচ বছরেও সে নির্বাচন হয়নি। এই পাঁচ বছরে আমরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। সংবিধানের মূলমন্ত্র গণতন্ত্র। কিন্তু এই পাঁচ বছরে কি আমরা সে গণতন্ত্র দেখতে পেয়েছি? নির্বাচন দেবে বলে তারা ভাওতাবাজি করেছে। ভাওতাবাজিতে পুরস্কার পদ্ধতি থাকলে তারা মেডেল পাওয়ার যোগ্য হতো।’
খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে কামাল হোসেন বলেন, ‘তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার কারামুক্তি চাই। যেখানে এতদিন পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেখানে খালেদা জিয়াকে, একটি বড় দলের নেত্রীকে পরিত্যক্ত জেলে রাখা হয়েছে। তাকে মুক্তি দিতে হবে। তাকে ছাড়াও হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, সংবিধান সমুন্নত থাকবে না।’বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি খুব জোর গলায় বলতে পারি, সম্পূর্ণ সরকারি চাপের মুখে খালেদা জিয়াকে বেআইনিভাবে সাজা দেওয়া হয়েছে। আমি আজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। বিচার বিচারের মতো হতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় যেন কোনও ব্যক্তির বিচার না করা হয় সেজন্য আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকি। যখন সরকার দ্বারা আক্রান্ত হই তখন এই মহান ভবনে আসি, একটু আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু বিচার বিভাগে সেই আশ্রয়টুকুও আমাদের আজ নেই।’বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিম্ন আদালতে গেলে সেখানে বিচার পাওয়া যায় না। আমাদের বহু নেতাকর্মী এই অবস্থার সম্মুখীন। এর পরিবর্তন আনতে হবে।’মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি শ্রদ্ধার কথা স্মরণ করে বলতে চাই, দেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা এই বন্ধাত্বের যুগে, যখন কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না, সত্য বলে না, তখন এই মানুষটি দাঁড়িয়েছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সত্য রায় দিয়েছিলেন, সত্য বলেছিলেন। এজন্য সরকার তাকে জোরজবরদস্তি করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে।’ বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাদের বক্তব্যে বিচারপতি সিনহার কথা উল্লেখ না করায় মর্মাহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, ‘আমি আশা করেছিলাম আপনারা আজ তাকে স্মরণ করবেন। কিন্তু কেউ সেটি করলেন না। আমাদের সবার উচিত তাকে গভীর শ্রদ্ধা জানানো এবং তিনি যে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছেন সেগুলো বারবার বলা উচিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সব আইনজীবীদের আন্দোলন নামার আহবান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে মানুষ আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘যে কারণে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, ৪৭ বছর পর স্বাধীনতার সে মূল চেতনা আর নেই। এই সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগ, জনগণ, মানুষের স্বাধীনতা হারিয়েছে।’প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মওদুদ বলেন, ‘এ নির্বাচনে একটি ঐক্য প্রয়োজন। ড. কামাল হোসেনকে বলেছি, আপনি এগিয়ে আসুন, ১৬ কোটি মানুষের নেতৃত্ব দিন। এরপর ড. কামাল আসলেন, নেতৃত্ব দিলেন। তাই নির্বাচনের অংশ হিসেবেই এই নির্বাচনে এলাম। অথচ সেই নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীরা যখন শোডাউন নিয়ে মনোনয়ন ফর্ম নিতে আসলো তখন হেলমেট পড়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালানো হলো। তাদের এই হামলা নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের যে গতি তা নিবারণের জন্য। তবুও আমরা নির্বাচনে আছি এবং থাকবো। ধানের শীষের জোয়ারে নৌকা ভেসে যাবে।’সমাবেশে উপস্থিত বক্তাদের আলোচনা থেকে গৃহীত ১১টি সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। সিদ্ধান্তগুলো হলো:

১. বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, ২. খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সব ফরমায়েশি সাজা বাতিল, ৩. বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা মামলাসহ সব রাজনৈতিক সাজা বাতিল, ৪. জামিনযোগ্য অপরাধে আগত বিচারপ্রার্থীরা বিচার থেকে বঞ্চিত, ৫. মাসদার হোসেন মামলার আলোকে গেজেট সংশোধন, ৬. প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান, ৭. দেশের আইনজীবী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি, ভুয়া ও রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, ৮. দেশের আইনজীবী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি, ৯. বাকস্বাধীনতা হরণকারী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮সহ সব কালো আইন বাতিল, ১০. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার স্থগিত, সংবাদকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে সংবাদ পরিবেশনে বিধিনিষেধ আরোপ বাতিল এবং বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়ন এবং ১১. মানবাধিকারে সাংবিধানিক ‘অধিকার’ রক্ষা করতে হবে।

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের সদস্য সচিব এ এম মাহবুব উদ্দিনের সঞ্চলনা এবং সংগঠনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, জগলুল হায়দার আফ্রিক, সুব্রত চৌধুরী, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বদরুদ্দোজা বাদল, খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রমুখ।এ সময় জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ব্যারিস্টার এ কে এম এহসানুর রহমান ছাড়াও দেশের ৫৪টি জেলার আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।