বুধবার, ১২ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা শীর্ষক গোলটেবিলে বক্তারা

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, তার জন্য দেশত্যাগ কোনো সমাধান না। সংখ্যালঘুদের দেশে থেকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকার আদায় করতে হবে। প্রশাসন, নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। একইভাবে যে ব্যক্তিরা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেন, আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দল থেকে তাঁদের মনোনয়ন বাতিল করতে হবে। মনোনয়ন পেলেও ভোটে এসব ব্যক্তিকে বয়কট করতে হবে।

আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় নির্বাচন: সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন।

নাগরিক সমাজ আয়োজিত এ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা জানান, আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কায় অনেকে দেশ ছাড়ছেন, অনেকে ব্যাগ গুছিয়ে অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার জন্য।

গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করলে, কথা বললে, তার বেলায় শূন্য সহনশীলতা দেখানো হচ্ছে। নির্বিচারে গ্রেপ্তার, আদালতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই ‘প্রায় ব্লাসফেমি’ আইনের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।

সুলতানা কামাল বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সারা বছর নির্যাতনের পাশাপাশি নির্বাচনের সময় তা প্রকট আকার ধারণ করে। পুলিশ ও প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে, মানবাধিকারে বিশ্বাসী হলে, এ ধরনের নির্যাতন হওয়ার কথা না।

আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার অংশ হিসেবে মেয়েকে ধর্ষণ করতে এলে এক অসহায় বাবাকে বলতে হয়, ‘আমার মেয়ে ছোট, তোমরা একজন একজন করে মেয়ের কাছে যাও।’

গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তালিকায় নাম থাকা মোট ১৭ জন অতিথি অনুপস্থিত থাকায় বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পড়ে শোনান এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনায় গঠিত শাহাবুদ্দিন কমিশন ২০১২ সালে সরকারের কাছে সুপারিশসংবলিত যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।

মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ২৮ শতাংশ মানুষ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। ৬০-এর দশকে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে তা ১৩ দশমিক ৫ এবং ১৯৮১ সালে হয় ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ২০০১ সালে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে তা দাঁড়ায় মাত্র ৮ শতাংশে। আবুল বারকাতের গবেষণা মতে, এভাবে চলতে থাকলে ২০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের আর কোনো লোক থাকবে না।

সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন, যেসব নেতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক দল থেকে আসন্ন নির্বাচনে তাঁদের মনোনয়ন না দেওয়া এবং দলের কোনো পদেও না রাখা, নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক যেকোনো প্রচার থেকে সব দল বিরত থাকে কি না, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে তা কঠোরভাবে নজরদারি করাসহ মোট ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা খালেকুজ্জামান বলেন, হঠাৎ আক্রমণের শিকার হওয়ার চেয়ে নির্যাতন হবে, সারা বছর সে আতঙ্কে থাকা আরও ভয়াবহ। সংখ্যালঘুরা এ আতঙ্ক থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশে হিন্দুরা থাকলে রাজনৈতিক দলের ভোটে কাজে লাগে, আর দেশ ত্যাগ করলে জমিটা ভাগে পাওয়া যায়।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ নির্লিপ্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সংখ্যালঘু নির্যাতনে প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ আছে বলেই একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। তিনি রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনা এবং বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তা বন্ধ করতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

দৈনিক ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর একজন বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিলেই আর নির্যাতন হবে না। এখন একদল ভোট দেওয়ার জন্য, আরেক দল ভোট না দেওয়ার জন্য নির্যাতন করে। আর যাঁকে ভোট দেওয়া হলো সেই ব্যক্তিও আর পাশে দাঁড়ান না। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন, উল্লেখ করে তিনি সব সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর একজন ফোন করে বলেছিলেন, ‘আমরা ভোট দিতে চাই না, শুধু এ দেশটিতে থাকতে চাই।’ নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হচ্ছে, আবার রাষ্ট্রীয় ধর্মের কথাও আছে। সময় এসেছে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা। একই ভাবে মার্কা বা প্রতীক দেখে ভোট না দিয়ে প্রার্থী বাছাই করে ভোট দিতে হবে।

আইনজীবী তবারক হোসাইন বলেন, একচক্ষু হরিণবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন হলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব না। তিনি পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, বেসরকারি টেলিভিশনের টক শোতে কথা বলার অপরাধে বক্তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওয়াজ মাহফিলের নামে যে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, এ কারণে কাউকে ধরছে না।