বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং ৭ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

৬ সেপ্টম্বর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ৪২ তম মৃত্যুবার্ষিকী

alauddin khaআবু কামাল খন্দকার : নবীনগর সঙ্গীতের লালনভূমি। এই ভূমিতে জন্ম গ্রহণ করেছেন বিশ্ব বরেণ্য অনেক সঙ্গীতজ্ঞ। বিশ্বের দরবারে এখানকার সঙ্গীতজ্ঞরাই সর্ব প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয় উপমহাদেশের সঙ্গীতকে। পাক ভারত উপ মহাদেশের শাস্রীয় সঙ্গীতকে নিজ সাধনাবলে বিশ্ববাসীর দরবারে মহামান্বিতরূপে তুলে ধরেছেন যিনি সেই ক্ষণজন্মা শিল্পী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের কৃতি সন্তান সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ৪২ তম মৃত্যু বার্ষিকী ৬ সেপ্টম্বর। 
আনুমানিক ১৮৬২ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম সবদর হোসেন খাঁ, মাতার নাম সুন্দরী বেগম। তার ডাক নাম আলম। বড় ভাই ফকির (তাপস) আফতাব উদ্দিন খাঁর কাছে সঙ্গীতের খাতেখড়ি। সুরের সন্ধানে কিশোর বয়সে বাড়ী থেকে পালিয়ে গিয়ে যাত্রা দলের সাথে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। এখান থেকেই জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালী, কীর্ত্তন, প্যাচালী প্রভৃতি গানের সাথে পরিচিতি লাভ করেন। তারপর কলকাতায় যান সঙ্গীতে দীক্ষা নেওয়ার জন্য। ১৯১৮খ্রি: পর তিনি ভারতের মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বিট্রিশ সরকার তাকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের সঙ্গীত আকাদেমী পুরস্কার পান। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে আকাদেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘পদ্মভূষন’ ও ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিশ্বভারতী কতর্ৃীক দেশী ‘কোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত হন। ভারতের দিল্লি ও বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে আজীবন সদস্যপদ দান করেন। শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসাবে কিছুকাল অধ্যাপনা করেন তিনি। বাশি, পিক্স, সেতার, মেন্ডেলীন, ব্যাঞ্জো, বেহালা, ষ্টাফ নোটেশন, শানাই, নাকাড়া, টিকারা, তবলা, সরোদ, শিখেন। এভাবে তিনি সর্ববাদ্য বিশারত হয়ে ওঠেন। সঙ্গীত জীবনে তিনি বড় ভাই ফকির আফতার উদ্দিন, ননোগোপাল, অমৃত লাল দত্ত, লবু সাহেব, অমর দাস, হাজারী ওস্তাদ, ওস্তাদ আহাম্মদ আলী খাঁ, তানসেন বংশীয় বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ সহ আরো অনেকের কাছে তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর অত্যন্ত দুরুহ এবং সুক্ষ সঙ্গীত কলা কৌশল শেখেন। ১৯৭২ সালের এই দিনে (৬ সেপ্টম্বর) ভারতের মাইহারের মদিনা ভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ এই বিশেষ দিনটি দেশ বিদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলেও নিজ জন্মভূমি শিবপুর গ্রামে এখনো ওস্তাদজির জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী তেমনভাবে পালিত হয় না। শিবপুরে প্রতিষ্ঠিত আলাউদ্দিন কলেজ কর্তৃপক্ষ আলোচনা সভা এবং সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি সংসদ ক্ষুদ্রপরিসরে কিছু আয়োজন করে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ ও তার পরিবারের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য শিবপুরে সরকারী, বেসরকারী পর্যায়ে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। ওস্তাদ পরিবারের লাখু খাঁ বলেন, আশির দশকের গোড়ার দিকে কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক শিবপুর এসে দেশী বিদেশী সঙ্গীত পিপাসুদের জন্য আলাউদ্দিন পল্লীতে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যেখানে স্থান পাওয়ার কথা ছিল ফকির (তাপস) আফতাব উদ্দিনের মাজার, সুর সম্রাটের নামে মিউজিয়াম, সঙ্গীত একাডেমী, পাঠাগার, মিলনায়তন, মুক্তমঞ্চ, পিকনিক কর্ণার ও অতিথিশালা। এই বিশাল সঙ্গীত পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তোলার জন্য যে জমির প্রয়োজন ছিল ওস্তাদ পরিবারের পক্ষ থেকে লাখু খাঁ তার দাদা আফতাব উদ্দিনের মাজারের উত্তর দিকে ২২ শতক জমি রেজিষ্ট্রি করে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু সে প্রকল্প আর বাস্তবায়িত হয়নি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র সহস্তে নির্মিত শিবপুর একমাত্র স্মৃতিবাহক ঐতিহ্যবাহী মসজিদটিও তেমনভাবে সংস্কার হচ্ছে না। শৈশবের আবাস্থল এখন নিশ্চিহ্ন প্রায়। এমনিভাবে ওস্তাদজির পিতা সবদর হোসেন খাঁ ও মাতা সুন্দরী বেগমের কবরটিও ভেঙ্গে পার্শ্ববর্তী পুকুরে বিলীন হতে চলছে। তার অংশের বসতবাড়ী টুকু অরক্ষিত। শিবপুরে বিখ্যাত খাঁ পরিবারের যারা এখনও শিবপুরে আছেন তাদের আর্থিক অবস্থা সোচনীয়। অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তারা এখন আর কেউ সুরের পেছনে ছুটতে পারছেন না জীবন ও জিবীকার তাগিদে। ফলে সুরের জন্য বিখ্যাত শিবপুরের খাঁ পরিবারটি দিনে দিনে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। এ উপলক্ষ্যে সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে (৬/৯) শনিবার শিবপুর সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কলেজে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। 

 

এ জাতীয় আরও খবর