বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাচ্ছে জামায়াত!

033447Pic-25দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকতে পারছে না। এ অবস্থায় নেতাকর্মীরা ধরেই নিয়েছে ভবিষ্যতে তারা প্রকাশ্যে আর কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে না। তাই ঠিক হয়েছে, আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই দলের নেতাকর্মীরা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাবে—সম্প্রতি রাজধানীর বনশ্রী এলাকা থেকে কোটি টাকাসহ গ্রেপ্তার জামায়াত-শিবিরের পাঁচ নেতাকর্মী জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানিয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। পাঁচজনকে রামপুরা থানায় ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পাঁচজনের মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় হিসাবরক্ষক গিয়াসউদ্দিন ও সহকারী হিসাবরক্ষক আমিনুর রহমানও আছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার আগে বরাবরই জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হয় তা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। এবার দলীয় আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করেছেন জামায়াত নেতারা। তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, রাজপথে মিছিল করে ঝটিকা হামলা ও বোমা বিস্ফোরণ। এতে বাধা পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাঠকর্মীদের। এ ক্ষেত্রে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলায় হামলার উদ্দেশ্যে চার-পাঁচজনের টিম গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ওই টিমের সদস্যদের সব ধরনের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়। প্রতি টিমের নেতৃত্বে রয়েছে একজন শিবিরকর্মী। হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে টিমের সদস্যরা কখনো এক এলাকায় থাকে না।

এক এলাকার টিম অন্য এলাকায় গিয়ে হামলা চালিয়ে কিছুদিন গা ঢাকা দেয়। এরপর নতুন হামলার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে জেএমবিসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদেরও সহযোগিতা নেওয়া হয়।  গ্রেপ্তার পাঁচজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় ঘিরে যেকোনো সময় জামায়াত-শিবির নাশকতা চালাতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নিষিদ্ধের জন্য মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এ বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সব কিছু মিলে জামায়াত অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে বলে গ্রেপ্তারকৃতদের তথ্যে মনে হয়েছে। পুলিশ বলছে, রিমান্ডে জামায়াতের কেন্দ্রীয় হিসাবরক্ষক গিয়াসউদ্দিন তাদের জানিয়েছেন, ‘জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।’    তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে তিনজন জামায়াতের মাঠকর্মী। তারা মূলত মাঠপর্যায়ে নাশকতার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। তাঁরা হলেন আবুল হাশেম, ওসমান গনি ও শাহাদাতুর রহমান। গত শনিবার দুপুরে বনশ্রীর একটি বাসা থেকে এ তিনজনসহ তাঁদের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় তাঁদের তথ্যমতে, এক কোটি সাড়ে ৪৭ হাজার টাকা ও কিছু জিহাদি বই জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় দায়ের করা দুই মামলায় আদালতের মাধ্যমে তাদের ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বানচাল করতে জামায়াত ২০১৩ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে বলে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ফাঁসির রায় ও তা কার্যকর হওয়াকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আরো ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে জামায়াতের। নিজামীর ফাঁসির রায় ঘিরে তারা বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরো বলেন, কোটি টাকাসহ গ্রেপ্তার জামায়াতের নেতাকর্মীদের ৫ জানুয়ারি নাশকতা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল। ৪৫ লাখ টাকাই তারা মাঠপর্যায়ে নাশকতার কাজে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কখন, কোথায় হামলা চালানো হবে তার একটি ছকও কষে রেখেছিল তারা। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ে দলীয় নেতারা ছিন্নমূল-ভবঘুরে ও  মাদকাসক্ত কিশোরদের টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। ২০১৩ সালেও এ ধরনের কিশোর-যুবকদের রাজধানীসহ সারা দেশে বোমা হামলার জন্য ব্যবহার করা হতো।

নিজামীর ফাঁসির রায় ঘিরে যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, দক্ষিণখান, মোহাম্মদপুর, উত্তরাসহ ছাড়াও গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় চোরাগোপ্তা হামলার পরিকল্পনা ছিল। জনসমাবেশে হামলার টার্গেটও ছিল। পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সারা দেশে গত পাঁচ মাসে ২০টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় জেএমবির সম্পৃক্ততা থাকলেও নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে জামায়াত-শিবির। জঙ্গি হামলার ঘটনায় জেএমবি, আনসারুল্লাহ, হুজিবিসহ যখন যারাই গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সরাসরি যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। জঙ্গি হামলার ঘটনায় গত পাঁচ মাসে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৪২ জন পাওয়া গেছে, যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনার পর আইএসের নামে যে টুইট বার্তা দেওয়া হচ্ছে তা বাংলাদেশ থেকেই ইন্টারনেটে আপলোড করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র পরিকল্পিতভাবে হামলা, হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, পরিকল্পিতভাবে জঙ্গি হামলার ঘটনা আরো বাড়বে। আগামীতে যুদ্ধাপরাধের বিচার, নির্বাচন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাবেশসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে জঙ্গি হামলা ঘটতে পারে। হুমকির ঘটনাও বাড়বে। জঙ্গি সদস্যদের পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, জামায়াত-শিবির মরণকামড় দিতে শুরু করেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ ধরপাকড়ের কারণে জামায়াত-শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যত হামলার ঘটনার ঘটছে তার মূলেও তারা। র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিটি হামলার ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। জেএমবি আগের মতো সংগঠিত নয়। জেএমবির শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ নেতা কারাগারে। বাইরে দুই-একজন থাকলেও তাদের ভূমিকা তেমন একটা নেই। তারা বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালাচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শনাক্ত করে একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে, হামলার পর আইএসের নামে দায় স্বীকারের বার্তা দেশ থেকেই ইন্টারনেটে আপলোড করা হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদুল হক বলেন, হামলাকারীরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তারা পার পাবে না। সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে বেশির ভাগ সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জামায়াত ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দেশে জঙ্গিবাদ দমনে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।

 

সূএ : কালের কন্ঠ

এ জাতীয় আরও খবর