বুধবার, ১২ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের ট্রফি জয়ের দুঃখ কি ঘুচবে

news-image

চীনের দুঃখ যদি হয় হোয়াংহো, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দুঃখ অবশ্যই এশিয়া কাপ। ইতিহাস জানাচ্ছে, এই একটি মাত্র আসর যেখানে গত ছয় বছরে ৫০ ওভার ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট মিলিয়ে দু’দুবার ফাইনাল খেলে একবারও ট্রফি নাগাল পায়নি টাইগাররা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, দুবারই ছিল দেশের মাটিতে। প্রথমবার ২০১২ সালে পাকিস্তানের কাছে ২ রানের পরাজয়ের আক্ষেপ এখনো পোড়ায় গোটা জাতিকে। আর পরের বার ২০১৬’তে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের ফাইনালে ভারতের কাছে ৮ উইকেটের ব্যবধোনে হেরে ট্রফি জয় না করার হতাশার ভান্ডারকে করেছে ভারি।

এবার তৃতীয়বারের মত এশিয়া কাপের ফাইনালে মাশরাফির দল। দুই বছর আগের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের মত কালকের ফাইনালেও বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। পার্থক্য দুটি- প্রথমতঃ এবারের এশিয়া কাপ ৫০ ওভারের আর খেলা হচ্ছে আরব আমিরাতে।

শুধু এশিয়া কাপের কথা বলা কেন, সেই ১৯৮৬ সাল থেকে একদিনের ক্রিকেট খেলতে শুরু করা বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৫০ ও ২০ ওভারের কোন প্রতিষ্ঠিত আসরের ট্রফি জয়ের স্বাদ পায়নি। শুধু মাত্র ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আইসিসির দুই সহযোগি সদস্য বার্মুডা ও কানাডার বিপক্ষে একটি তিনজাতি আসরের শিরোপা জিতেছিল হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ। রাউন্ড রবিন লিগ পর্যায়ের ওই আসরে বাংলাদেশ প্রথমে বার্মুডাকে ৮ উইকেটে এবং পরের ম্যাচে কানাডাকে ১৩ রানে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে।

ব্যাস! সেটাই প্রথম ও শেষ। এরপর থেকে আজ অবধি দেশে ও বিদেশে কখনো কোনো তিন জাতি ট্রফি জয়েরও রেকর্ড নেই বাংলাদেশের। শুধু ত্রি-দেশীয় সিরিজ নয়, আইসিসির পূর্ণ সদস্য তথা টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশগ্রহণে কোন আসরের কোন ট্রফি এখনও জিততে পারেনি বাংলাদেশ।

ফাইনাল খেলা বহূদুরে, ১৯৮৬, ১৯৮৮ আর ১৯৯৫ সালে প্রথম তিনবারের এশিয়া কাপে একটি ম্যাচও জেতা সম্ভব হয়নি। শুধু অংশগ্রহণটাই ছিল বড়। ১৯৯০ সালে আরব আমিরাতের শারজায় অস্ট্রেলেশিয়া কাপেও আন্ডারডগ বাংলাদেশের কাছে ম্যাচ জেতা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।

এরপর ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালমপুরে আইসিসি ট্রফি বিজয়ের বছরেও বাংলাদেশ কোন ওয়ানডে আসরে ফাইনাল খেলতে পারেনি। ওই বছর জুলাইতে শ্রীলঙ্কায় হওয়া এশিয়া কাপে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পিছনে চার নম্বর হয়েই ছিল বাংলাদেশ। এমনকি একই বছর অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের মাটিতে তিনজাতি আসরেও ফাইনাল খেলা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশকে পিছনে ফেলে জিম্বাবুয়ের সাথে ফাইনাল খেলেছিল কেনিয়া।

এরপর ১৯৯৯ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে যাবার আগে দেশের মাটিতে প্রথম একটি তিনজাতি টুর্নামেন্টের স্বাগতিক হয় বাংলাদেশ। ‘মেরিল কাপ’ নামের ওই আসরে প্রতিপক্ষ ছিল আইসিসির সহযোগি সদস্য দেশ- কেনিয়া আর টেস্ট খেলুড়ে দল জিম্বাবুয়ে। ওই টুর্নামেন্টেও ব্যর্থতার ঘানি টানে বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে আসর জেতা বহুদূর, ফাইনালই খেলতে পারেনি।

এরপর ২০০৩ সালে টিভিএস কাপ আর ২০০৮ সালে কিটপ্লাই কাপ নামে আরও দুটি তিনজাতি আসর বসে বাংলাদেশে। দু’বারই ফাইনালে স্বাগতিকরা ছিল দর্শক।

টাইগাররা প্রথম তিন জাতি ফাইনাল খেলে ২০০৯ সালে। কাকতালীয়ভাবে এবারের মত ওই আসরেও তিন প্রতিযোগি দল ছিল বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়ে। ফাইনালে টাইগারদের প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। রাউন্ড রবিন লিগ পর্যায়ে শ্রীলঙ্কাকে হারালেও ফাইনালে গিয়ে আর পারেনি বাংলাদেশ।

২০১২ সালে দেশের মাটিতে ৫০ ওভারে এশিয়া কাপে প্রথমবার ফাইনালে পৌঁছে হই চই ফেলে দেয় টাইগাররা। সেবার টাইগারদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যের কাছে হার মেনে ফাইনালের আগে ছিটকে পড়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কা; কিন্তু ফাইনালে গিয়ে আর শেষ রক্ষা হয়নি। পাকিস্তানের কাছে শেষ ওভারে মাত্র ২ রানের পরাজয় সঙ্গী হয়ে থেকেছে। তার চার বছর পর ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপে আবার ফাইনালে ওঠে টাইগাররা; কিন্তু শেষ হাসি হাসা সম্ভব হয়নি। ভারতের কাছে ৮ উইকেটের পরাজয় আক্ষেপের ফর্দটা দীর্ঘই করেছে টাইগারদের।

এ বছর আরও দুবার ট্রফি জয়ের সুযোগ এসেছিল। প্রথমবার বছরের শুরুতে ঘরের মাঠে তিন জাতি আসরে। পরেরবার শ্রীলঙ্কায় তিন জাতি আসরে। প্রথমটি ৫০ ওভারের। পরেরটি টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে। দুবারই ফাইনালে গিয়ে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ‘নীল’ হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

জানুয়ারিতে ঘরের মাঠে তিনজাতি আসরে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে আরও একবার ৫০ ওভারের ফরম্যাটে প্রথম ট্রফি জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করে বাংলাদেশ। এরপর গত মার্চে শ্রীলঙ্কার মাটিতে তিন জাতি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট ‘নিদাহাস ট্রফির’ ফাইনালে শেষ বলে গিয়ে হেরে বসে ভারতের কাছে।

অবশেষে এবার আরব আমিরাতের দুবাইতে ট্রফি বিজয়ের আরেক সুযোগ এসেছে টাইগারদের সামনে। অথচ কী কাকতালীয় ঘটনা, ৩২ বছর আগে কল্পিত হৃদয়ে শত সংশয়-শঙ্কায় প্রথম ৫০ ওভারের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিল টাইগাররা, আবারো সেই আসরে ট্রফি জয়ের হাতছানি মাশরাফি বাহিনীর।

আগের দুই বার না পাবার বেদনায় দগ্ধ মাশরাফির দল এবার সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাততে পারবে তো? অবশেষে এশিয়া কাপ উঠবে মাশরাফির হাতে? ট্রফি জিততে না পারার আক্ষেপটা কি ঘুচবে এবার?