বুধবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০১৯ ইং ১০ই মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামো গ্রেডে সমন্বয় হবে: শ্রম সচিব

news-image

পোশাক শ্রমিকদের জন্য গতবছর ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোর সাতটি গ্রেডের মধ্যে যে তিনটি গ্রেড নিয়ে আপত্তি এসেছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছেন শ্রম সচিব আফরোজা খান।বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা কমিটির প্রথম সভার পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।শ্রম সচিব বলেন, “আমরা দেখতে পেয়েছি সাতটি গ্রেডের মধ্যে ১, ২, ৬ ও ৭ গ্রেডে সমস্যা নেই। ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডে একটু অবজারভেশন আছে, সেটা আমলে নিয়েছি।“এখানে যেহেতু ক্যালকুলেশনের ব্যাপার আছে, সেজন্য আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য আরও ছোট পরিসরে আগামী রোববার বসে সেটার সমাধান খুঁজে বের করব। কোথায়, কীভাবে করলে সেই সমন্বয়টা আমরা করতে পারি, যাতে এই সমস্যা সমাধান হয়…।”

মজুরি কাঠামো নিয়ে টানা কয়েক দিন ধরে শ্রমিক বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে বুধবার শ্রম সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের এই পর্যালোচনা কমিটি করে শ্রম মন্ত্রণালয়। সেখানে মালিক পক্ষের পাঁচজন, শ্রমিক পক্ষের পাঁচজন ছাড়াও বাণিজ্য সচিবকে সদস্য করা হয়।কমিটির সদস্যদের নিয়ে বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসার আগে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন শ্রম সচিব।

বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় পর্যন্ত পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক শেষ না হওয়া শ্রম প্রতিমন্ত্রী তার কক্ষেই অবস্থান করেন।সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এসে শ্রম সচিব বলেন, “শ্রমিক ভাই-বোনদের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, ৮ তারিখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১০ তারিখে মিটিংয়ে বসেছি, সবার কাছ থেকে আমরা শুনেছি সমস্যাগুলো কোথায়।“আপনারা প্লিজ সরকারের প্রতি আস্থা রাখুন। এ সরকার নতুন এসেছে… এটা সব সময়ই শ্রমিকবান্ধব সরকার… সরকার এ বিষয়ে খুব সিরিয়াস, আমরা খুব সিরিয়াসলি চেষ্টা করছি। যে কাজটা করতে হচ্ছে, সেজন্য ন্যূনতম সময় প্রয়োজন, আমরা শ্রমিক ভাই-বোনদের কাছে সেই সময়টুকু চাচ্ছি।”

সমস্যা কোথায়?

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণ করে গত ২৫ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে তা কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয় সেখানে।মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও অনান্য খাতের শ্রমিকদের মজুরির বিবেচনায় পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি ছিল বিভিন্ন বাম শ্রমিক সংগঠনের। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় বিক্ষোভ, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি পালন করে আসছিল সংগঠনগুলো।ভোটের পর নতুন সরকারের শপথের আয়োজনের মধ্যেই গত ৬ জানুয়ারি ঢাকার বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে পোশাক শ্রমিকরা।

তাদের অভিযোগ, সরকার তাদের জন্য যে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে, তাতে কয়েকটি গ্রেডের কর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছে।এই নতুন মজুরি কাঠামোতে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে মজুরি বেড়েছে যথাক্রমে ৪১, ৪৪ ও ৪৬.৫৫ শতাংশ। কিন্তু আন্দোলনকারীরা বলছেন, বাস্তবে তৃতীয় গ্রেডের মূল বেতন কমে গেছে, বাকি দুই গ্রেডে বেড়েছে নামমাত্র।তারা বলছেন, ২০১৩ সালে যখন সর্বশেষ বেতন বাড়ানো হয়, তখন তৃতীয় গ্রেডে মূল বেতন হয় ৪ হাজার ৭৫ টাকা। বছরে ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির পর ওই গ্রেডের একজন শ্রমিকের মূল বেতন এখন ৫ হাজার ২০৪ টাকা হওয়ার কথা। আর নতুন কাঠামোতে তৃতীয় গ্রেডের মূল বেতন ঘোষণা করা হয়েছে ৫ হাজার ১৬০ টাকা।

তাদের এই হিসাবে তৃতীয় গ্রেডে বেতন কমেছে ৪৪ টাকা; একইভাবে চতুর্থ গ্রেডের মূল বেতন ৭৯ টাকা এবং পঞ্চম গ্রেডে ১৬৪ টাকা বেড়েছে। অথচ সপ্তম গ্রেডে নতুন শ্রমিকদের বেতন বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা।এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে শ্রম সচিব বলেন, মজুরি কীভাবে সমন্বয় করা হবে সেই নির্দেশনা গেজেটে দেওয়া আছে। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কোনোভাবেই কোনো শ্রমিকের বেতন কমবে না।“শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আমিও বলতে চাই- যে মজুরি ঘোষিত হয়েছে, একজন শ্রমিক আগে যে মজুরি পেয়েছেন সেটার বেসিক বা গ্রস কোনোটাই কমবে না।”সচিব বলেন, “ফ্যাক্টরির মিড লেভেলে যারা মজুরি দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছেন, মালিকদেরও অনুরোধ জানাব, তারা এ বিষয়টি ভালভাবে একটু দেখবেন, যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়।”

তাহলে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন আসলে কত টাকা বেড়েছে জানতে চাইলে সচিব বলেন, “আমরা এটা হিসেব-নিকাশ করব। আমাদের কাছে উনাদের (শ্রমিক) যে বক্তব্য আছে সেটা হল- অন্য লোয়ার গ্রেডে যে পরিমাণ বেড়েছে সেই তুলনায় এই লেভেলে যারা কাজ করেন তাদের বেতন আশানারূপভাবে বাড়েনি।“উনারা বলেছেন, এই লেভেলে যারা কাজ করেন তারা সব থেকে বেশি পরিশ্রম করেন, বিষয়টি আমরা দেখব।”বেতন কাঠামোয় সমন্বয় আনতে কয়েক দিন সময় চেয়ে শ্রমিকদের উদ্দেশে সচিব বলেন, “আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, আপনারা প্লিজ সুশৃঙ্খলভাবে কাজে ফিরে যান, আপনারা আমাদের প্রতি আস্থা রাখেন, আমরা আপনাদের বিষয়গুলো সিরিয়াসলি দেখছি।”

‘অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা’

পোশাক শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভে কোনো মহলের ইন্ধন থাকতে পারে বলে মনে করছেন শ্রম সচিব আফরোজা।তিনি বলেন, “একটা ফ্যাক্টরিতে যে মজুরি হওয়ার কথা তার থেকেও বেশি পরিমাণে বেতন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানেও ভাংচুর হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি এই সেক্টরে হয়ত একটা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। …তাই এখানে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয় আছে।”সচিব বলেন, উত্তরায় আবাসিক এলাকায় গাড়ি ভাংচুর হয়েছে, অথচ সেখানে কোনো ফ্যাক্টরি নেই। সে কারণেই তাদের ধারণা হয়েছে, ‘কোনো একটি মহল’ এই খাতকে ‘ধ্বংস করার পাঁয়তারা’ করছে।

“শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে বলব, আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের অর্থনীতির মূল যে গার্মেন্টস সেক্টর, সেই সেক্টরকে কোনো ক্রমেই ধ্বংসের দিকে যেতে দিতে চাই না। যদি কোনো দুষ্টচক্র থেকে থাকে, আমরা তাদের যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করব।”

শ্রমিকদের অভিযোগ শুনতে ‘হট লাইন’

পোশাক শ্রমিকরা যাতে তাদের সব ধরনের অভিযোগ যে কোনো সময় জানাতে পারেন, সেজন্য একটি হট লাইন চালু করবে শ্রম মন্ত্রণালয়।শ্রম সচিব বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, শ্রমিকরা যাতে কোনো ধরনের সমস্যা, সেটা তার বেতন হোক, যে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয় হোক, তাৎক্ষণিকভাবে যাতে অভিযোগ করতে পারে, সেজন্য হটলাইন থাকবে, সেটা ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে।”

কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরে এই ‘হট লাইন’ স্থাপন করা হবে জানিয়ে আফরোজা বলেন, “একজন শ্রমিক সরাসরি তার যে কোনো সমস্যা জানাতে পারব। এখন একটা নম্বর দিয়ে শুরু করা হবে, আগামী সপ্তাহে এই নম্বর বাড়ানো হবে। আমরা মাইকিং করে সব শিল্প এলাকায় সেই নম্বরগুলো শ্রমিকদের জানিয়ে দেব।”