বুধবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং ৩রা আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে

news-image

সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে একটি ছোট্ট প্রবন্ধ লিখতে যাওয়ার মত বড় স্পর্ধা আর হয় না। তিনি এত বিশাল একজন মানুষ ছিলেন এবং তার অভিজ্ঞতার ঝুলি এত ব্যাপ্ত যে, তাকে একটি প্রবন্ধে ঠাঁই দিয়ে চেনানোর চেষ্টা রীতিমত অপমানজনক। আমরা তাই সেদিকে চেষ্টা না করে তার প্রাথমিক পরিচয় দিয়েই চলে যাব তার বিখ্যাত ও প্রবাদপ্রতিম ভ্রমণ কাহিনী “দেশে বিদেশে” নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করতে।

এই বইটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে ধরা হয় (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)। প্রায় শতাব্দী পার হতে চলল, এই বই এর আবেদন তারপরেও সব বয়সের মানুষের কাছে এখনও অত্যন্ত উঁচু।

সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সাব-রেজিস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাঁর পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী। তাঁর পৈতৃক ভিটা মৌলভীবাজার, সিলেট। সিলেটের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পিতার বদলির চাকরি হওয়ায় সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কাটে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯২১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথমদিকের ছাত্র। এখানে তিনি সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, হিন্দি, গুজরাটি, ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষাশিক্ষা লাভ করেন।শান্তিনিকেতনে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আফগানিস্তান সরকারের অনুরোধে “কাবুল কৃষি কলেজে” ফার্সি এবং ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

বইটির নাম দেশে বিদেশে দেখে এটা অনেক গুলো দেশের ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে লেখা বই মনে হলেও আসলে এখানে কেবলমাত্র দুটি দেশের কথাই বলা আছে। কিন্তু এটুকুর মাঝেই তিনি যে যাদু দেখিয়েছেন, তার তুলনা হয় না।

সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তার প্রতিটি লেখায় স্পষ্ট। আড্ডার মেজাজে আর চটুল ছন্দে আগাগোড়া একটি কাহিনী বর্ণনা করা, এবং তার সাথে সাথে বহু-ভাষাভাষী এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যবাহী একটি স্বল্পপরিচিত জাতিগোষ্ঠীর যুগান্তরের ঘটনাবহুল ইতিহাসকে বর্ণনা করতে পারা একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব। আফগান মীর চরিত্রের কণ্ঠে নিত্যদিনের বাংলায় কঠিন অথচ প্রাঞ্জল সংলাপগুলো পড়ে সহজেই বোঝা যায় ভাষাতত্ত্বে সৈয়দ মুজতবা আলীর শেকড় কত গভীরে প্রোথিত। আমাদের আটপৌরে মুখের ভাষায় যে সাবলীলতা আছে, প্রতিটি বাক্যের শব্দমালায় যে অন্তরঙ্গতা আছে সেটা বার বার উপলব্ধি করা যায় শুধু তার লেখা পড়লেই।

আফগানিস্তান রাজনৈতিক ভাবে একটি দেশ হতে পারে, কিন্তু রং-এ, রূপে, বৈচিত্র্যে, জাতিতে, ভাষায় গোটা বিশেক দেশকে হারিয়ে দিতে পারে। তাই বইটির নাম যদি বহুবচনে রাখা না হত তবে যেন ঠিক বই এর মুল ভাবটাকে তুলে আনা যেত না । জাতি বৈচিত্র্যের দিক থেকে পাকিস্তানও কম যায় না আফগানিস্তানের তুলনায়। সেই নমুনা দেখা যায় পেশোয়ারে- ডজন-খানেক ভাষা, আর ঠিক ততগুলো জাতি, ততগুলো জীবন দর্শন। আর এই বইয়ের মূল পটভূমি কাবুল তো বিচিত্রতায় অনন্য। পাঠান, হাজারা, তাজিক, ভারতীয় আর তাদের সাথে ভিড় জমিয়েছে আরও বিচিত্র ইউরোপীয় বিভিন্ন রসের দর্শকগণ। সব মিলিয়ে আফগানিস্তান আসলেই দেশ বিদেশ।

ছবিটি যদিও আধুনিক কাবুল এর, মুজতবা আলীর সময় থেকে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলা যায় না। ছবি সংগৃহীত।

সাধারণ জ্ঞান থেকে  আফগানিস্তান সম্পর্কে ধারণা হতেই পারে দেশটি ঊষর, মরুময়, ছায়াহীন, প্রাণহীন, জীবন স্পন্দন যেখানে রসহীন পাথর, আছে কেবল যুদ্ধ বিগ্রহ আর হানাহানি। কথাগুলো মিথ্যে নয়, তবে আফগানিস্তানের সৌভাগ্য, আর একই সাথে পাঠক হিসেবে আমরাও সেই সৌভাগ্যের অংশীদার যে সৈয়দ মুজতবা আলী সেই দেশে ভ্রমণ করেছিলেন। কোন ভ্রমণকারী যদি ভ্রমণ-স্থলকে উপভোগ করতে না পারেন, তার কাদা, তার বালু, তার পাহাড়, তার ফুল, তার কাটায় যদি সৌন্দর্য অনুভব করতে না পারে তবে সেটি তার অন্তরের দীনতা, আর সেই দীনতা তাঁর কোনদিনই ছিল না। তিনি যখন যেখানে গিয়েছেন, সেই জায়গাটাকে ঠিক সেখানকার মত করেই অনুভব করার চেষ্টা করেছেন। আফগানিস্তান এর বিভিন্ন বিষয়ে তার যে প্রাঞ্জল বর্ণনা তা পড়লে মনে হবে, তিনি যেন মরুতে মধুর চাষ করেছেন। পাকিস্তান সহ আফগানিস্তানের মানুষ, তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন, মনন, ধ্যান ধারনা, জীবনবোধ. কাবুলের বাজার, আফগানিস্তানের ঘটনাপঞ্জী, প্রতিটি বিষয় তিনি যথাযোগ্য মর্যাদায় রসময় করে তুলে এনেছেন। তার বর্ণনায় আফগানিস্তান যেন তুলে ধরেছে তার আপন রূপ অকৃপণতায়। আফগানিস্তান হয়তো সবার কাছে নিজেকে প্রকাশ করে না। কিন্তু লেখক এই রুক্ষ দেশটিকে বাধ্য করেছেন তার কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে।

আজকালকার ভ্রমণ-কাহিনী গুলো পড়লে একটা বিষয় দেখা যায়, সেখানে ভ্রমণ-কাহিনীর চেয়ে নিজের গল্পই বেশি থাকে, অথচ একটা ভ্রমণ কাহিনী হওয়া উচিত ঠিক তার উল্টোটা। গল্পটা হওয়া উচিত সেখানকার মানুষদের, সেখানকার প্রকৃতি আর সেখানকার সমাজ এবং সংস্কৃতি, ঠিক যেমনটা করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী।

একটা বই রিভিউ এর উদ্দেশ্য থাকে বইটা নিয়ে সম্ভাব্য পাঠকের মনে আগ্রহ তৈরি করার। সেই বই এর সবকিছু দুই লাইনে বলে না দেয়াটা বিশেষ জরুরী। তাই আমরা আর বেশি গভীরে গেলাম না, আশা করব বাংলাদেশের ভ্রমণ-পাগল মানুষেরা বইটি পড়বেন, অনুভব করবেন এবং ঠিক আমাদের মতই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবেন, কিভাবে এরকম একটি বই লেখা সম্ভব!

এ জাতীয় আরও খবর

কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে অস্ত্র বিক্রির কথা বললেন পুতিন

মেয়েদেরও খৎনা দেয়া হয়! জেনে নিন কতটা অমানবিকভাবে খৎনা দেয়া হয় নারীদের

পতিতালয়ে বাবা, খবর পেয়ে হাতেনাতে ধরলো ছেলে

বয়ফ্রেন্ডের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় প্রেমিকার উদ্ভট কাণ্ড!

আজ স্কুলে পেছনের বেঞ্চে বসা এমন কিছু শিক্ষার্থীর গল্প জানা যাক যারা জীবনে পেয়েছেন সফলতা

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের গ্র্যান্ড মসজিদ মুসলমানদের আত্মত্যাগের এক সাক্ষী

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তার অবহেলা করলে অভিযোগ করবেন যেভাবে

‘বিষকন্যার’ গল্প, মিলনেই মৃত্যু

‘আমার পক্ষে দলের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়, তাই পদত্যাগ করেছি’

ভারত জয় করে বাংলাদেশে আসছেন রানু?

মেকাপ ছাড়া ছবি পোস্ট করে আলোচনায় অভিনেত্রী

৩০ কোটি বছরের পুরনো প্রাণী ভেজে খেলেন মৎস্য শিকারী