রবিবার, ২৬শে মে, ২০১৯ ইং ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রিং দ্যা বেল

news-image

বেশ কিছুদিন আগে একটি ভিডিও ক্যাম্পেইনের শ্লোগান ছিলো “রিং দ্যা বেল।” ব্যাপারটি এরকম যে একটি ঘরের ভেতর থেকে স্বামী স্ত্রীর চিৎকার চেচামেচি ভেসে আসতে থাকে। স্বামীটি তার স্ত্রীকে পেটায়। স্ত্রীর চিৎকার কান্না, স্বামীর উচ্চকণ্ঠ এসবকিছু বন্ধ দরজার বাইরে থেকে আশেপাশের মানুষজন শুনতে পায়। কিন্তু যারা শুনছিলেন সেইসব প্রতিবেশী ইত্যাদি তাদের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া নেই। যে যার মত কাজ করে যাচ্ছে। একবার মুখ তুলে ঝগড়ারত দম্পতির দরজার দিকে তাকিয়ে আবার কাজে মন দিচ্ছে। প্রতীয়মাণ হয় যে এগুলো তাদের নিত্যদিনকার ঘটনা।

এর মধ্যে একজন মুচি যিনি সেই ঘরের পাশের রাস্তায় কাজ করছিলেন তিনি হঠাৎ ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ঐ দরজায় কলিং বেল বাজান। বেল বাজানোর সাথে সাথে ঘরের ভেতর সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায় এবং পেটানোর শব্দ বন্ধ হয়। স্বামীটি এসে দরজা খুললে সেই মুচি বলেন, ‘একটু পানি পাওয়া যাবে?’ স্বামীটি মাথা ঝাঁকিয়ে পানি আনতে ভেতরে যায়। গ্লাস হাতে ফিরে এসে দেখে দরজার সামনে কেউ নেই। পানি চেয়েছিলেন যিনি, তিনি নেই। ভিডিও এখানেই শেষ।

কি বোঝা গেলো উপরোক্ত এই ঘটনায়? বোঝা গেলো তাদের মারামারিতে ছেদ পড়েছে। বন্ধ হয়েছে। কিন্তু যিনি এতবড় একটি ঝগড়া এবং মারামারি বন্ধ করতে পারলেন তাকে কি করতে হয়েছে? তৃতীয় একজন ব্যাক্তির শুধু বেল বাজাতে হয়েছে আর দুটো কথা বলতে হয়েছে। তা ঝগড়া সম্পর্কিত না মোটেও। তোমরা থামো, এরকম কিছুও না। তাকে শালিস বিচার কিছুই করতে হয়নি। হয়ত স্বামীটি রাগের মাথায় মারতে মারতে স্ত্রীকে মেরে ফেলতে পারতো সেদিন, যদিনা ঐ মুহুর্তে কেউ বেল বাজাতো। সুতরাং বেল বাজান। কথা বলুন। কথা বলবার বিকল্প নেই।

ভালোবাসার দরকার আছে। কেয়ারিং এর দরকার আছে। এসব ছাড়া আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন সেটি সত্য হলেও ভালোবাসা এবং যত্ন ছাড়া জীবনের একটি বিড়াট অংশ খালি মনে হবে। আপনার জীবনে কিছু মানুষ থাকা দরকার যারা আপনাকে ভালোবাসে, মমতা করে, সময় দেয়, যত্ন নিয়ে আপনার কথাগুলো শোনে। তারা আপনার প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব বাবা-মা যে কেউই হতে পারে। সেই মুচি হতে পারে যার দরকারই ছিলোনা বেল বাজাবার। ঐ দম্পতিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করবার। হতে পারে সূদুর আফ্রিকায় বাস করা একজন মানুষ যাকে কখনো দেখেন নি কিংবা হতে পারে ভার্চুয়াল অ্যাসিসটেন্ট এলাইজা, যাকে অনুভব করা যায়না কিন্তু সে আপনার কথা শোনে, উত্তর দেয়। সুতরাং বলুন।

জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো কেউ আপনাকে কাগজে লিখে দিতে পারবে না। আপনাকে অবশ্যই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আর এই বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষ আহরণ করে কেবলমাত্র অন্য মানুষদের কাছ থেকে। তাদের সাথে কথা বলে। বিভিন্ন জাতের মানুষদের সাথে মিশে।

বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করবার আগেই আমার মনে হতো আমি প্রায় সবকিছুই জেনে গিয়েছি। এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সবকিছুই বইয়ে লিখা আছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্ভুলভাবে কাগজে লেখা প্রায় অসম্ভব। এবং এটি আমার এই পোস্ট সম্পর্কেও সত্য। আমি কিছুই লিখতে পারিনি এখানে যা যেভাবে লিখতে চেয়েছি।

যখন আজকাল সারা পৃথিবীর প্রায় সব জ্ঞান একটি মোবাইল অথবা মাউস কীবোর্ডেই পাওয়া যায় তখন মনে হতে পারে বাইরের পৃথিবীতে গিয়ে কিংবা নিজ বৃত্তের বাইরের মানুষের সাথে মিশে তাদের কাছে মনের হতাশা, না বলা কথা, নানাবিধ প্রশ্ন যার উত্তর পেতে ইচ্ছে করে, সেসব প্রকাশ করে জানতে চাওয়ার দরকার নেই। বইয়েইতো সব আছে। সিনেমা বই পত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে আমরাতো প্রায় সবকিছু সম্পর্কেই জেনে যাচ্ছি। তবুও এত প্রশ্ন যে মনে আসে, এত হতাশা অবসাদ এসব কেন আসে? কারণ, আমরা ঐসব জিনিসের মাধ্যমে আসলে সবকিছু জেনে যাচ্ছি না। সবকিছুর সমাধান পাচ্ছিনা।

সেই মুচি বই পড়ে জানতে পারেনি যে বেল বাজালে পেটানো বন্ধ হবে। সে জেনেছে নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। অন্যদের সাথে মিশে। অন্যদের সাথে নিজেকে শেয়ার করার মাধ্যমে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষক হচ্ছে মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা, অর্জিত এই জ্ঞান জানতে আপনাকে মানুষের কাছে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। নিজের হতাশা শেয়ার করতে হবে। বিষন্নতা থেকে মুক্ত হবার সেটিই সবচেয়ে বড় উপায়। জিজ্ঞেস করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে মনে যা পাহাড় গড়ছে প্রতিনিয়ত।

সুতরাং, প্রশ্ন করুন। আমরা উত্তর দেবো। আমরা হয়ত আপনার জীবনের সেই তৃতীয় ব্যক্তি, যে বেল বাজায়।

সালাম। আশা করি ভালো আছেন।

———————————-

**গ্রুপের লিংক : https://www.facebook.com/groups/2118763605029778/?hc_location=ufi

ছবিঃ নেট থেকে