মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০১৯ ইং ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আগুনে পুড়ছে ঢাকা : দুর্ঘটনা না নাশকতা?

news-image

নাগরিক সভ্যতার লোভ, পাপ আর উদাসীনতার আগুনে পুড়ছে রাজধানী ঢাকা। দেড় কোটি মানুষের এ নগরীতে আগুনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এসব অগ্নিকাণ্ড নাশকতা না দুর্ঘটনা? বনানীতে বৃহস্পতিবারের ভয়াল অগ্নিকান্ডে  ২৬ তাজা প্রাণের মর্মান্তিক মৃত্যুর দুই দিনের মাথায় গতকাল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভোরে গুলশানের ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ও সুপার মার্কেট পুড়ে ছাই হলো আর বিকালে গুলশান-২ নম্বরে বহুতল ডেল্টা লাইফ টাওয়ারে লাগল আরেক আগুন। ভোরের আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ও সুপার মার্কেটের ২ শতাধিক দোকান। সেটিও দ্বিতীয়বার পুড়ল দুই বছরের মাথায়। ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি এ রকমই এক ভোরবেলায় এ মার্কেটে আগুন লাগে। এরপর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে চারবার মার্কেট কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দিলীপ কুমার ঘোষ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর এক ব্রিফিংয়ে বললেন, ‘গুলশানের ডিএনসিসি কাঁচাবাজার ও সুপার মার্কেটটি আগেই অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। এ মার্কেটে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।’ এদিকে রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত বহুতল ডেল্টা লাইফ টাওয়ারের চতুর্থ তলার সার্ভার রুমে গতকাল বিকাল ৪টার দিকে আগুন লাগে। তৎক্ষণাৎ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এলেও ভবনটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আগুন নিয়ে খেলা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। আগুনের লেলিহান শিখা কোনো কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। এ প্রেক্ষাপটেই এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে- এসব আগুন পরিকল্পিত নাশকতাসংশ্লিষ্ট কিনা? কারণ, এর আগে মানবসৃষ্ট আগুনে বস্তিসহ বিরোধপূর্ণ স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার অনেক নজির রয়েছে। বনানীর এফআর টাওয়ারটিও ছিল বিরোধপূর্ণ স্থাপনা। এসব কারণেই সাম্প্রতিক অগ্নিকা গুলো নাশকতা কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর অডিটোরিয়ামে ‘নিরাপদ কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা : চকবাজার-পরবর্তী প্রস্তুতি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মেয়র এ আহ্বান জানান। সিটি মেয়র বলেন, ‘অনেক সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মনোমালিন্য বা ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে কিনা সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’

এদিকে চলতি শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকান্ডে র ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। গত মাসে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা অগ্নিকান্ডে  ৭১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার ২৬ জনের প্রাণ গেল। চুড়িহাট্টায় আগুনের ভয়াবহতায় জীবন্ত কয়লা হয়ে গেছে অনেকে। বনানীতে ছিল ধোঁয়ার ব্যাপকতা। এখানে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন অনেকে। এমনকি তীব্র ধোঁয়া থেকে বাঁচতে কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন। এ দুর্বিষহ দৃশ্য দেখতে হলো এ দেশের মানুষকে। বনানীর অগ্নিদুর্ঘটনাস্থলে ভবনের সারি দেখলে মনে হতে পারে কি সাদৃশ্যে সবাই মিলে একই আঙ্গিকে সারি সারি ভবন বানিয়েছেন। কেউই নিজেদের জায়গা ছাড়েননি। কেউই মানেননি ইমারত নির্মাণ আইন। ফলে দুর্যোগে-দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিংবা উদ্ধারকারী দল ভবনে ঢুকতে পারে না। মানুষ বাঁচাতে পারে না। প্রতিটি বড় ঘটনার পর সরকারের মন্ত্রীরা জোর ঘোষণা দেন। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দায়দায়িত্ব নিয়ে কথা বলে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সবাই ভুলে যায় যার যার করণীয়।

স্থাপনা প্রকৌশলীরা বলছেন, আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সেন্ট্রাল এসির লাইন, অপটিক্যাল ফাইবার, বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম, পার্টিক্যাল বোর্ডসহ যেসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয় তার সবই উচ্চ দাহ্য পদার্থ। ফলে অগ্নিকা  ঘটলেই দ্রুত তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা খুব একটা রাখা হয় না। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় এ অবস্থা খুবই ভয়াবহ; যা নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ঘটনার মাধ্যমে অনেকেরই জানা। বর্তমানে নতুন ঢাকারও বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা বা প্রশিক্ষিত লোকজন তেমন নেই। যেগুলোয় আছে তাও নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না।

এদিকে রাজধানীর অভিজাত গুলশান, বনানী, বারিধারার ২ শতাধিক ভবনের অগ্নিকা  মোকাবিলার সক্ষমতা নেই। এ এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন দূতাবাস, কূটনৈতিক মিশন ছাড়াও বেশ কয়েকটি বহুজাতিক ও দেশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়। রয়েছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয়ও। ২০১৭ সালে গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে অগ্নিকান্ডে র পর ঢাকার স্থাপনাগুলোর অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ করে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিদুর্ঘটনা রোধের সক্ষমতা যাচাইয়ে ভবনগুলোর ভূগর্ভস্থ জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, ধোঁয়া ও তাপ শনাক্তকরণ যন্ত্রের উপস্থিতি, মেঝের আয়তন, জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ও প্রয়োজনীয় লিফটের উপস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে ভবনগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের মূল্যায়নে গুলশান, বনানী ও বারিধারার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর মধ্যে ৪৬টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে দ্রুততম সময়ে অগ্নি ও ভুমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে সংস্থাটি। পাশাপাশি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভবন ও প্রতিষ্ঠান মালিকদের একাধিকবার চিঠিও দেয় ফায়ার সার্ভিস। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তা কার্যকর করেনি।

এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীতে ১০ তলার বেশি উচ্চতাসম্পন্ন বহুতল ভবন রয়েছে ২ হাজার ৯০০-এর বেশি। এসব ভবনের প্রায় ৯০ শতাংশেই অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নেই। সে হিসেবে রাজধানীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ বহুতল ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ যেসব বহুতল ভবনে সর্বাধুনিক অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা থাকার কথা সেগুলোই ঝুঁকির তালিকায়। সে ক্ষেত্রে এক তলা থেকে ছয় তলার প্রায় ২১ লাখ ১২ হাজার স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। এ ভয়াবহতার মধ্যে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন রাজধানীর জীবিকাতাড়িত দেড় কোটি মানুষ।

নাশকতা না দুর্ঘটনা : এদিকে একের পর এক অগ্নিকা  নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা- এ নিয়ে নানা মহলে চলছে জল্পনা। বনানীর এফআর টাওয়ার ও গুলশান ডিসিসি মার্কেটের অগ্নিকান্ডে  উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পাশাপাশি এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে এসব অগ্নিকা  নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা- তা তদন্ত করে বের করার তাগিদ দিয়েছেন খোদ ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

জাতীয় পার্টির যুগ্মমহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘একের পর এক অগ্নিকা  দুর্ঘটনা নাকি সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে কোনো চক্রের নাশকতা- তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সরকারবিরোধীরা রাজপথে আন্দোলন করার মতো কোনো ইস্যু খুঁজে পাচ্ছে না। যদি কোনো চক্র ইস্যু তৈরির জন্য হীন-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে তাহলে তাদের খুঁজে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি আগুনের পেছনে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম থাকে তাও খুঁজে বের করতে হবে।’

জানা গেছে, বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে র আগের রাতে অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে জমির মালিক ২১, ২২ ও ২৩ নম্বর ফ্লোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খালি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর আগেও মৌখিকভাবে ওই অবৈধ দখলদারকে নোটিস দিয়েছিলেন জমির মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানি। আবার রাজউকের অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ১৮ তলা থেকে অতিরিক্ত ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছিল একই নির্মাতা কোম্পানি। তবে সেসব ফ্লোরের দখলদার ছিলেন তৃতীয় এক ব্যক্তি। যিনি ওই ভবন থেকেই নিজ ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, এফআর টাওয়ারের জমির মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি ও ২১, ২২, ২৩ তলার মালিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল।

অন্যদিকে ডিএনসিসির গুলশান মার্কেটে অগ্নিকা কেও অনেকে পরিকল্পিত নাশকতা বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেননা একই মার্কেটে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে অগ্নিকা  ঘটেছিল। সে সময় মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, বহুতল ট্রেড সেন্টার নির্মাণের কথা বলে এ মার্কেট ভেঙে ফেলার একটা চেষ্টা ছিল, তার মধ্যেই অগ্নিকা  ঘটে। এর দুই বছরের মাথায় আবারও একই রকমভাবে অগ্নিকা  ঘটায় জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

এ জাতীয় আরও খবর