রবিবার, ২১শে জুলাই, ২০১৯ ইং ৬ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির পথে সরাইলের শিকারি কুকুর গ্রে হাউন্ড

news-image

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গ্রে হাউন্ড জাতের কুকুর প্রায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আর এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেই দায়ী করছেন পশুপ্রেমীরা।তাদের অভিযোগ, পশু হাসপাতালে কুকুরের বিভিন্ন রোগের ওষুধ না থাকা, কুকুর পালনকে শিল্প হিসাবে ঘোষণা না করা, ঋণ না পাওয়াসহ নানাবিধ কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রে হাউন্ড কুকুর।

ঐতিহ্যের শুরু যেভাবে : গ্রে হাউন্ড কুকুরের ইতিহাস জানিয়েছেন সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের চর্মকার তপন লাল।তিনি বলেন, প্রায় দেড়শ’ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এই কুকুর পালন শুরু হয়েছে। দেওয়ান মস্তু মিয়া নামে এক লোক কলকাতা থেকে সরাইল আসার সময় গ্রে হাউন্ড কুকুর সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। মস্তু মিয়ার দেহরক্ষী ছিলেন তপন লালের দাদা গঙ্গাচরণ রবি দাস।

চর্মকার তপন লাল বলেন, দেওয়ান সাহেব আমার দাদাকে এই কুকুর পালনের অনুমতি দিয়েছিলেন। পরে কুকুরটি পর্যায়ক্রমে ৬টি বাচ্চার জন্ম দেয়। কুকুরগুলো বড় হলে বিক্রির জন্য দেওয়ান সাহেবের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, তুমি যেহেতু লালন-পালন করেছো, বিক্রি করে যে টাকা পাবে তা তুমি নিয়ো।‘এরপর থেকে দাদা, বাবা, চাচা, আমিসহ বংশানুক্রমে কুকুর পালন করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন এসে আমাদের কাছ থেকে কুকুর কিনতো। এমনকি সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আমাদের গ্রে হাউন্ড কুকুরের বাচ্চা কিনে নিয়ে গেছে। একেকটি কুকুর ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি।’

ঐতিহ্যবাহী কুকুরটি কেন হারিয়ে যাচ্ছে?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একসময় আমাদের বাড়িতে অনেক কুকুর ছিলো। এখন অর্থ আর চিকিৎসার অভাবে কুকুর পালতে পারি না। ডাক্তাররা বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন না। কুকুরের রোগবালাই দেখা দিলে সঠিক চিকিৎসাও দিতে পারি না। ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় আমার অন্তত ১৫-২০টি কুকুর মারা গেছে। বর্তমানে আমার কাছে তিনটি কুকুর আছে।তপন লাল দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছি না। সরকার যদি আমাদের ঐতিহ্যটা ধরে রাখার ব্যবস্থা নেয় তাহলে হয়তো গ্রে হাউন্ড কুকুর বিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, গ্রে হাউন্ড কুকুর দেখতে সাধারণ কুকুর থেকে কিছুটা আলাদা। এদের মুখ অনেকটা শেয়ালের মতো। লম্বা কান। সাদা, কালো, লালসহ বিভিন্ন রঙের এসব কুকুর একসময় শিকারের কাজে ব্যবহার করা হতো। শিয়াল, বনবিড়াল, বাঘডাস শিকারে এরা বেজায় পারদর্শী। তাছাড়া চোর-ডাকাতরাও গ্রে হাউন্ড কুকুরকে একটু বেশিই ভয় পায়।

কথা হয় তপন লালের স্ত্রী লক্ষ্মী রানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামী বাড়ির বাইরে গেলে আমিই কুকুরগুলোর দেখাশোনা করি। ওদের যথাসময়ে খাবার দিতে হয়। অপরিচিত লোকজন দেখলে যাতে কামড় না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখি।কুকুর কিনতে আসা আলামিন মিয়া বলেন, আমি অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছি গ্রে হাউন্ড কুকুর নেওয়ার জন্য। কিন্তু এই কুকুর সহজে পাওয়া যায় না।স্থানীয়রা বলেন, সরাইলের এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব। সরকার যদি একটা প্রজনন কেন্দ্র চালু করে তাহলে এ কুকুর উৎপাদন বাড়বে।

জেলা প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে সরাইল উপজেলা পরিষদের আর্থিক সহযোগিতায় সমাজকল্যাণ দফতর ও পশু সম্পদ দফতরের যৌথ তত্ত্বাবধানে উপজেলা পরিষদের পাশে গ্রে হাউন্ড কুকুরের খামার চালু হয়। পরবর্তীতে আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে ১৯৮৮ সালে খামারটি বন্ধ হয়ে যায়, যা আর চালু হয়নি। সে জায়গায় এখন আনসার-ভিডিপির অফিস চালু হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গণেশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, গ্রে হাউন্ড কুকুর সংরক্ষণ ও প্রজনন কেন্দ্রের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্প শুরু করবো।সরাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম মোসা  বলেন, সরকারিভাবে প্রাণিসম্পদ বিভাগ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই কুকুর সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে।

বাংলানিউজ