মঙ্গলবার, ২৩শে জুলাই, ২০১৯ ইং ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

নারী নেতৃত্বের অগ্রদূতী : ড. ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া

news-image
মোঃ তারিকুল ইসলাম সেলিম : নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ডক্টর অব লজ উপাধিতে ভূষিত হওয়ায় দেশের প্রথম মহিলা ব্যারিস্টার ড. রাবিয়া ভূঁইয়াকে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট সংবর্ধনা দিয়েছে। ২০১৮ সালের ৯ই আগস্ট রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইন মন্ত্রী এ্যাড. আনিসুল হক, আপিল বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার, বিচারপতি হাসান ফায়েজ সিদ্দিকী, দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম এনায়েতুল রহিম, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিশিষ্ট আইনজীবি ড. কামাল হোসেন, সুপ্রিমকোর্ট আনইজীবি সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার এলিসন ব্লেক, ইউনিভাসির্টি অব লন্ডন-এর পরিচালক সাইমন আস্কে সহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গগণ উপস্থিত ছিলেন।
২০১৮ সালে ৬ই মার্চ বৃটেনের ইউনিভাসির্টি অব লন্ডন-এর ১৫০ তম প্রতিষ্ঠা বাষির্কী উপলক্ষে ড. ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়াকে ডক্টর অব লজ উপাধিতে ভূষিত করেন। দেশ-বিদেশে নারীদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অপরিসীম অবদান স্বরূপ তাকে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়। তিনি এশিয়ার দ্বিতীয় নারী হিসেবে এ সম্মান অর্জন করেন। বাংলাদেশের একজন নারীর এমন অর্জন উপ-মহাদেশের জন্য কম গৌরবের কথা নয়। ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়ার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কথা শুনে আমিও যাওয়ার জন্য মনস্থির করেছিলাম। সেদিন প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় যেতে পারিনি। আমার স্বগ্রামের রত্নবধূ শ্রদ্ধীয়া মামী প্রখ্যাত আইনবিদ ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়াকে তাঁর কাজে স্বীকৃতি স্বরূপ এমন সম্মাননা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। তিনি এদেশে নারী মুক্তি আন্দোলনে সামনে সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব সু-পরিচিত ও সম্মানিত।
একজন কল্যাণকামী, মমতাময়ী, মানবতাকর্মী মানুষ হিসেবে সব সময় তিনি এদেশের অবহেলিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত নারী সমাজের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্মের উপর আলোচনার প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি থেকে দেরিতে হলেও আমি সংক্ষেপে লেখার চেষ্টা করছি। নারী নেতৃত্বের অগ্রদূতী ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া ১৯৪৪ সালে ১লা মার্চ তিনি ঢাকায় জম্ম গ্রহন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের তাঁর পিতৃক নিবাস। বাবা দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব মরহুম আব্দুল হামিদ যুক্তরাজ্যের এড-লীডস এর ডিন ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আশুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নাওঘাট গ্রামে প্রখ্যাত ভূঁঁইয়া বাড়িতে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী প্রখ্যাত আইনবিদ একে কে এম মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া এম.কম এলএলবি, ব্যারিস্টার এ্যাট-ল’ (লিঙ্কন’স ইন, যুক্তরাজ্যে) এফ.সি.এ। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি উচ্চতর (আইন বিদ্যায় বি.সি.এল ও হিসাব বিজ্ঞানে এফ.সি.এ) ডিগ্রী অর্জনের অধিকারী ছিলেন।
ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূইঁয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ ডিগ্রী অর্জনের পর আরো উচ্চতর শিক্ষা আরোহনে যুক্তরাষ্ট্র ও বিলেতে (ইংল্যান্ড) পাড়ি জমান। সেখান থেকে এলএল.এম (কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র), ব্যারিস্টার এ্যাট-ল’ (লিঙ্কন’স ইন, যুক্তরাজ্যে), বি.সি.আই (ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যে), কৃতিত্বের সাথে আইন শাস্ত্রে ব্যারিস্টারি (বি.সি.এল) ডিগ্রী অর্জন করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ব্যারিস্টার হিসাবে ইতিহাসের পাতায় নিজেকে অভিসিক্ত করেন।
সেখান থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। সম্প্রতিককালে তিনি আমেরিকা থেকে পি.এইচ.ডি (ডক্টরেট ডিগ্রী) অর্জন করেন। বহুমাত্রিক ডিগ্রীর অধিকারী ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া আইন ব্যবসার পাশাপাশি বহুবিধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমিতি-সংস্থার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে কাজ করে থাকেন। তিনি আন্তর্জাতিক মহিলা আইনজীবি ফেডারেশনের (ফিডা) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগীয় অঞ্চলের সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ মানব অধিকার সংস্থা আইডিয়ালের নির্বাহী পরিচালক, মানব অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন ফোকাসের সম্পাদিকা, বাংলাদেশ মানবাধিকারের কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি হচ্ছেন ইনস্টিটিউট অফ ডেমোক্র্যাটিক রাইটস (আইডিআর) নামীয় একটি আইনী সহায়তা ও মানবাধিকার বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব।
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ মহিলা সংস্থার নির্বাহী সদস্য ও আইন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান, উইমেন ফর উইমেনরঃ রিসার্চ এন্ড স্টাডি গ্রোপের কোষাধ্যক্ষ ও আইন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান, গণতান্ত্রিক অধিকার ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালিকা সহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক জড়িত থেকে কাজ করে দেশ-বিদেশে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ ল’ রিপোর্ট কাউন্সিলের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট এর ল’ রিপোর্টার এবং বিভিন্ন আইন সংক্রান্ত পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে থাকেন। ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া শুধু একজন নারী নেত্রী ও আইনবিদ-ই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতেও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
নারী জনপ্রতিনিধি হিসেবে ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও ১৯৮৫ সালে নাইরোবি-তে অনুষ্ঠিত ইউএন ডিকেড অফ উইমেন (নারী জাতিসংঘ দশক) সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধিনিধিত্ব করেন। খুবই সামান্য পরিমান উন্নত দেশ গুলোতে নির্দিষ্ট করে নারীর জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, এবং চাকুরির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিশেষ সহায়তায় ‘ফরোয়ার্ড লুকিং স্ট্র্যাটেজিস’ ডকুমেন্টে তিনি একটি অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ ৩৩২ এ আনয়নে উপায়ভুত হন। অন্যান্য কার্যাবলীর মধ্যে, তিনিই প্রথম হিংস্রতার শিকার নারীদের জন্য অভিযোগ কেন্দ্র, সামাজিকভাবে অন্তরায়গ্রস্ত নারী (প্রতিতা)’ দের চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন চালু করেন।
সচেনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি লিঙ্গ সংবেদনশীল আইন সংক্রান্ত বিষয়াদি শিক্ষার কর্মসূচীও চালু করেন। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ এর মত খসড়া আইন প্রণায়ন করেন, নারীদের সুবিধার্থে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আইন, যৌতুক নিষিদ্ধ আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ সংশোধন করেন। সংসদে এক-তৃতিয়াংশ আসনে নারীদের সরাসরি ভোটের মাধ্যেমে নির্বাচনের জন্য তিনি জাতীয় সংসদে বিল উপস্থাপন করেন। নারীর অধিকার বহু মামলা আইনে অগ্রাধিকার পায় এবং ল’ জার্নালে (আইনী সাময়িকী) প্রতিবেদিত হয়। এক্ষেত্রে জামিলা খাতুন বনাম রুস্তুম আলী’র মামলাটি একটি মাইলফলক, যা স্ত্রী ও সন্তানের অতিত ভরনপোষন সংক্রান্ত প্রথাগত হানাফী আইনকে পরিবর্তন করে এবং ভবিষ্যতের অনুসরন করার মত একটি ঐতিহাসিক মামলা হচ্ছে হেফজুর রহমান বনাম সামছুন্নাহার বেগম এর মামলা।
ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া শিক্ষাবিস্তারে ভূঁইয়া একাডেমি, নাওঘাট আব্দুর রউফ দাখিল মাদ্রাসা, সোনারগাঁও নানাখীতে ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নাওঘাট গ্রামের নাওঘাট-খাকচাই সড়কটি নির্মান করেন এছাড়াও তিনি সারাদেশেই অনেক স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভাট ,বিদ্যুৎ সহ বহু উন্নয়ন মূলক কাজ করেছেন এবং আজও করে যাচ্ছেন।
ব্যারিস্টার ড. রাবিয়া ভূঁইয়া হচ্ছেন এদেশে নারী অধিকার অর্জনের আন্দোলনের প্রবর্তক।  নারী সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আইনজীবিদের জন্যও মাইলস্টোন। তিনি সমাজের অবহেলিত, লাঞ্ছিত-বঞ্ছিত, নির্যাতিত-নিপীরিত নারী সমাজকে পিছনে থেকে অনেক সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন। তার কর্মময় জীবন সকলে কাছে আজ অনুসরনীয়-অনুকরনীয়। এই মহিয়সী নারী রত্নগর্ভা নাওঘাট গ্রামকে বিশেষ সম্মানের আসনে অলংকিত করেছেন। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
লেখক: লোক-সাহিত্যনুরাগী, রাজনীতিক কর্মী ও সংগঠক

এ জাতীয় আরও খবর

বরগুনা হাসপাতাল থেকেই ফাঁদে মিন্নির পরিবার

তিন মাথা নিয়ে বেঁচে আছে সেই শিশু, অবাক চিকিৎসকরা

ছেলেধরা সন্দেহে গণপি’টুনি, পরে জানা গেল ছিঁচকে চোর

বিয়ের আসরে হঠাৎ হাজির ট্রাম্প, চুম্বন করলেন কনেকে

মিঠুন-মুশফিক ঝড়ে বড় জয় বাংলাদেশের

এরশাদের শূন্য আসন ধরে রাখা অস্তিত্বের লড়াই : যোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে জাতীয় পার্টি

রংপুর মহানগর যুবলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বঙ্গবন্ধু ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন

রংপুরে ট্রাক চাপায় গণপাঠাগারের কর্মী নিহত

লিভারের ক্ষতি করে যেসব অভ্যাস

১৩৩টি গ্রামে তিন মাসে একটিও কন্যাসন্তান জন্মায়নি!

শৈলকুপায় সেচখালে ঘন জঙ্গল পাড়ের মাটি কেটে রাস্তা নির্মান