শুক্রবার, ২১শে জুন, ২০১৯ ইং ৭ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

উচ্চ শ্রেণীর সঙ্গে চেয়ারে খেতে বসায় পিটিয়ে হত্যা

news-image

ডেস্ক রিপোর্ট।। ভারতের গুজরাটে বিয়ের অনুষ্ঠানে উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে চেয়ারে খেতে বসায় জিতেন্দ্র (২১) নামে এক দলিত সম্প্রদায়ের যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুজরাটের প্রত্যন্ত কোট গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৬ এপ্রিল একদল উচ্চ শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে দলিত সম্প্রদায়ের জিতেন্দ্রকে মারধরের অভিযোগ উঠে। মারধরের ৯ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিতেন্দ্রের মৃত্যু হয়। জিতেন্দ্র কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন এবং তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আর তার অপরাধ ছিল, বিয়ে বাড়িতে তিনি সবার সঙ্গে চেয়ারে বসেছেন।

সেদিনের বিয়ের অনুষ্ঠানে কয়েকশো অতিথি যোগ দিয়েছিলেন, তবে তাদের একজনও বলতে রাজী হননি গত ২৬ এপ্রিল সেখানে কী ঘটেছিল। পরে পুলিশ ঘটনাটি ফাঁস করে দেয়। বিয়ের খাবারটি উঁচু বর্ণের অধিবাসীদের দিয়ে রান্না করা হয়েছিল। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের দলিতদের তৈরি খাবার তারা স্পর্শ করেন না।

পুলিশ কর্মকর্তা অশোক কুমার বলেন, খাবার বিতরণের সময় মারধরের এ ঘটনা ঘটে। চেয়ারে বসা নিয়ে বিতর্কে এ ঘটনার সূত্রপাত। পরে ভারতে নিপীড়নের শিকার নিম্নবর্ণের মানুষদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য যে আইনটি আছে, (শিডিউলড কাস্ট এন্ড শিডিউলড ট্রাইবস, প্রিভেনশন অব এট্রসিটিস এক্ট), সেই আইনে এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়।

ভারতে হিন্দুদের মধ্যে যে কঠোর বর্ণপ্রথা, সেখানে সবার নিচে দলিতদের অবস্থান। সারা দেশজুড়ে দলিতরা নানা অত্যাচারের মুখোমুখি হতে থাকে। গত মাসের এই ঘটনা তার বড় উদাহরণ। স্থানীয় দলিত সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, বিয়েতে জিতেন্দ্রকে বেধড়ক মারধর ও অপদস্ত করা হয়েছিল। তারা বলেন, জিতেন্দ্র কাঁদতে কাঁদতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। কিন্তু রাস্তায় তার ওপর আবার হামলা করা হয়। সে সময় তারা খুব নিষ্ঠুরভাবে তাকে মারধর করে।

ঘটনার পরদিন সকালে জিতেন্দ্রর মা গিতা দেবী বাড়ির বাইরে থেকে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। গিতা দেবী বলেন, সারারাত ধরে হয়তো সে ওখানে পড়ে ছিল। তার পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সে কথা বলতে চেষ্টা করেও পারছিল না। বাড়ির বাইরে তাকে কে ফেলে গিয়েছিল সে বিষয়ে কিছু জানি না। ঘটনার ৯ দিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

জিতেন্দ্রর মৃত্যু গিতা দেবীর কাছে দ্বিগুণ হৃদয়বিদারক ঘটনা। গত পাঁচ বছর আগে তার স্বামীও মারা যান। পরিবারে একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি ছিলেন কাঠমিস্ত্রির কাজ করা এই জিতেন্দ্র। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব তাকে একজন শান্ত স্বভাবেই মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি খুব কম কথা বলতেন।

প্রিয়জনেরা তার মৃত্যুর জন্য ন্যায়বিচার দাবি করেছে। কিন্তু সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায়বিচার দাবির পক্ষে তারা সামান্য সমর্থন পাচ্ছেন। দলিতদের নিয়ে কাজ করা জাবার সিং ভারমা বলেন, পরিবারটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে। যেখানে ভয়ের পরিবেশ বিরাজমান। তাদের কোনো জমি নেই এবং তারা আর্থিকভাবে ভঙ্গুর।

জিতেন্দ্রের গ্রামে ৫০টি পরিবারের মধ্যে দলিত পরিবারের সংখ্যা ১২/১৩টি। উত্তরখণ্ড রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ হচ্ছে দলিত। এই রাজ্যে দলিতদের বিরুদ্ধে এরকম সহিংসতার অনেক ইতিহাস আছে। এ ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু তাদের সবাই এ ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে।