বুধবার, ১৯শে জুন, ২০১৯ ইং ৫ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রথম গেজুয়েট নারী বেগম শামসুন্নাহার

news-image

মোঃ তারিকুল ইসলাম সেলিম : শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবিকা বেগম শামসুন্নাহার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রথম গেজুয়েট নারী। বেগম সামসুন্নাহার ছিলেন এ অঞ্চলে সমগ্র নারী সমাজে আলো হাতে আঁধারের যাত্রী। তিনি অশিক্ষার নিকষকালো অন্ধকারে তলিয়ে থাকা নারী সমাজকে আলোর মিশিলে সম্পৃক্ত করে সামনে সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঐতিহাসিকভাবে তিনি নারী সমাজে এক অবিস্মরণীয় নাম। যেকালে মুসলিম সমাজের মেয়েদের লেখাপড়া করা ছিল অত্যন্ত দুরুহ একটা ব্যাপার তেমনি কঠিন ছিল নারীদের ঘর থেকে বেড় হওয়া। পর্দাপ্রথা, কুসংস্কার, সামাজিক অনুশাসন, ধর্মীয় গোঁড়ামি এ সবই ছিল নারী শিক্ষার বিরাট প্রতিবন্ধিকতা। সেকালে এই মহিয়সী নারী মুসলিম সমাজের নারী শিক্ষার প্রতিরুদ্ধ প্রাচীর ভেঙ্গে সারা জীবন মানুষ গড়ার কাজে মানষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে গেছেন। জীবনের সত্য সোপন ধরে যাঁরা রেখে যান চিন্তা ও কর্মে জাগ্রত জীবনের অনুধ্যান- তাঁদেরই একজন ছিলেন শিক্ষাবিদ বেগম শামসুন্নাহার। কর্ম, মানবতা ও শান্তির উত্থিত পতাকা হাতে ধাবমান হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর আদর্শের একাত্মা হয়ে নিরলস চিত্তে কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর অকৃত্রিম আন্তরিকতা, সময়নিষ্ঠতা ও কর্তব্য সচেতনতা তাঁকে অধিষ্ঠিত করেছিল হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ পরিচালিত হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষা পদে। বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই তিনি তাঁর মহান কর্মানুশীলনের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ব্রিটিশ দুঃশাসন আর ধর্মীয় অন্ধ অনুশাসনে এদেশের নারী শিক্ষা যখন বন্দীদশায় লীন তখন নারী মুক্তির আরেক বার্তা নিয়ে ১৯২৬ সালে ১৪ জানুুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আশুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নাওঘাট গ্রামে প্রখ্যাত মোক্তার বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন বেগম শামসুন্নাহার। পিতা আব্দুল হামিদ ভূঁইয়া ছিলেন সুুুনামধন্য মোক্তার ও মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুসলিম লীগের সেক্রেটারী জেনারেল। পেশায় মোক্তার ও রাজনীতিক হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট। উনিশো ছয়ত্রিশ সালে কুঁড়লিয়া (এন্ডারসন) খাল খননে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তাঁর প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও প্রেরণায় শহর ও গ্রামে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মডেল গালর্স হাইস্কুল, তালশহর এ.এ.আই উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মূক-বধির বিদ্যালয়, ইন্ড্রাস্ট্রিয়েল স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় তাঁর শ্রম ও একগ্রতা সর্বজন-বিদিত। মা সুফিয়া খাতুন ছিলেন গৃহিনী। বেগম শামসুন্নাহার পিতা-মাতার প্রথম সন্তান ছিলেন। একজন শিক্ষিত, সচেতন, আইনজ্ঞ ও রাজনীতিক পিতা হিসেবে নারী শিক্ষার প্রচন্ড ইচ্ছা ও প্রয়োজনীয়তাকে সমাজে বাস্তবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে নিজ কন্যাকে উচ্চ শিক্ষায় গড়ে তোলার সিদ্ধান্তই ছিল পিতার। যে কারণে অন্য দশটা ছেলে-মেয়ের চেয়েও কম বয়সে মেয়েকে স্কুলে পাঠান তিনি। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সমাজে নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করা উদারপন্থী পিতার অধীর আগ্রহ ও অনুপ্রেরণায় তৎকালীন সময়ে বাই সাইকেলে চড়ে স্কুলে যেতেন বেগম শামসুন্নাহার। একই সঙ্গে শ্ত্যটিং প্রশিক্ষণ করার সুযোগও করে দিয়েছিলেন পিতা। গর্বিত পিতার মেধাবী ও দুঃসাহসী কন্যা বেগম শামসুন্নাহার সব সময়ই ভাল রেজাল্ট করে শিক্ষার সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে আসছিলেন। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে বেগম শামসুন্নাহার ছিলেন প্রথম। ১৯৪০ সালে সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি সরোজনী গার্লস হাই স্কুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪২ সালে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আই এসসি পাস করেন। বেগম শামসুনাহার যেহেতু লেখাপড়ায় ভাল ছিলেন এবং তাঁর পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ছিল তাই তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য কলিকাতার লেডী ব্রাবোর্ন কলেজে ভর্তি করানো হয়। ১৯৪০ সালে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন শেরে -এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি তখন বাংলার প্রাইম মিনিস্টার (প্রধানমন্ত্রী)। তিনি অন্তরের গভীর থেকে অনুভব করতেন বাংলার মুসলিম মহিলা সমাজ অন্য সম্প্রদায়ের মহিলাদের থেকে বিশেষত্ব শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে আছে। তাই তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাবে ও উদ্যোগে সে সময়ের গর্ভনরের পত্নীর নামনুসারে প্রতিষ্ঠা করলেন কলিকাতা লেডী ব্রাবোর্ন কলেজ। বেগম শামসুন্নাহারের পিতা আব্দুল হামিদ ভূইঁয়া সে সময়ে খ্যাতিমান মোক্তার ও সুনামধন্য রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ায় শেরে -এ-বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল। এজন্য কলেজ প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই তাঁকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতার লেডি ব্রার্বোন কলেজ থেকে মেধার অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে বি,এ পাস করেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাব ডিভিশন (বর্তমান জেলা)’র মধ্যে প্রথম বি,এ পাস নারী এবং পরবর্তী একযুগ অর্থাৎ ১২ বছরের মধ্যে ব্রাহ্মবাড়িয়ায় অন্য কোন নারী বি,এ পাস করেনি। তিনি যখন বি, এ পাস করেন তখন বাংলা বেগম সামসুন্নাহারের ছড়িয়ে পড়ে। তাকে দেখতে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষজন বাড়িতে এসে ভিড় করে । ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি, টি পাস করেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, নারী সাংবাদিকতা অগ্রপথিক কথাশিল্পী লায়লা সামাদ, বেগম পত্রিকার সম্পাদিকা নুুরজাহান বেগম, মহিলা ক্রীড়াবিদ রাবেয়া খাতুন তালুকদার, কথা সাহিত্যিক ও গীতিকবি জেব-উন নেসা জামাল, সঙ্গীত শিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানুর মতো দেশবরেণ্য অনেক নারী ছিলেন বেগম সামসুুন্নাহারের কলেজ জীবনে সহপাঠী। তাঁরা সবাই লেডি ব্রার্বোন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। বেগম সামসুুন্নাহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাঠ চুুুকিয়ে ১৯৪৮ সালে ঢাকার টিকাটুলি কামরুননেসা সরকারি গার্লস হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা হিসাবে চাকুরীতে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিন মাইল দূরে পয়াগ গ্রামের নিবাসী আলহাজ্ব মোঃ সেকান্দর আলীর বড় ছেলে মোঃ সিরাজুল ইসলামের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন। জনাব সিরাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল থেকে অর্থনীতি বিষয়ে মাস্টার্স করার পর চট্রগ্রামে একটি প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপনায় রত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকায় কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার পদে চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ১৯৮৬ সালে কৃষি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার (জি.এম) হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। বেগম শামসুন্নাহার-এর ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া একজন প্রকৌশলী। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক পরবর্তীতে বাংলাদেশ যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর গ্রহন করেন। অবসরের পর ১৯৯৬ সালে থেকে ২০০১ পর্যন্ত পাঁঁচ তিনি বঙ্গবন্ধু (যুুুুমনা) সেতুর রেলওয়ে প্রকল্পের কনসালন্টেট টীমের প্রধান পরামর্শ হিসেবে কাজ করেন। দ্বিতীয় ভাই মরহুম আতিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ছিলেন উত্তরা ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এম,ডি) থাকা অবস্থায় পরলোক করেন। তৃতীয় ভাই পানি বিজ্ঞানী ড. সাদিকুল ইসলাম ভূঁইয়া সিভিল ইঞ্জিনিয়ার । তিনি ফিলিপাইনের ম্যানিলায় সায়েন্টিফিক কর্মকর্তা ছিলেন। ছোট বোন আশরাফুন্নাহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করেন এবং ইংল্যান্ডে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন।

বেগম শামসুন্নাহার টিচার্স ট্রেনিং ইংলিশ কোর্স করার জন্য ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডের (বিলেত) স্কটল্যান্ডে যান। দেশে ফিরে সরকারি চাকরির ধারাবাহিকতায় তিনি ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি গালর্স হাই স্কুলে যোগদান করেন। পরবর্তীতে যশোর গালর্স হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। এখান থেকে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ফরিদপুর সরকারি গালর্স হাই স্কুলে যোগদান করেন। পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গা সরকারি গালর্স হাই স্কুলে যোগদান করে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি টাঙ্গাইল বিন্দু বাসিনী সরকারি গালর্স হাই স্কুলে বদলী হয়ে যান । এসময় তিনি এক বছরের ছুটি নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল করাচিতে অবস্থান করেন। করাচি থেকে ফিরে নারায়ণগঞ্জ সরকারি গালর্স হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৩ সালে পুনরায় টাঙ্গাইল বিন্দু বাসিনী সরকারি গালর্স হাই স্কুলে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে আবারো ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি গালর্স হাই স্কুলে বদলী হন। সর্বশেষ সেখান থেকে আবারো তাঁর জীবনের প্রথম চাকুরী স্থল কামরুননেসা সরকারি গালর্স হাই স্কুলে যোগদান করেন এবং ১৯৮৭ সালে অবসর গ্রহন করেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের শিক্ষিত মননশীলতায় তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় গড়ে তুলেন। বর্তমানে বেগম শামসুন্নাহারের একমাত্র ছেলে ডাঃ সালাহউদ্দীন শাহরিয়ার আমেরিকার পেনসিল ভেনিয়ায় একটি গ্রুপ অব কোম্পানীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে ডাঃ ফাতেমা তুজ জোহরা মিমি ডিপো-মেট আমেরিকান বোর্ড ও ফ্যামিলি মেডিসিন এর সদস্য এবং তার স্বামী ডাঃ কাজী তারিকুল ইসলামও সেখানে কর্তব্যরত। তাঁর বড় মেয়ে ডাঃ শাহীন শাহরায়ার বর্তমানে গাজীপুর জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত। স্বামী ডাঃ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া নিউরো মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়-এ সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। শামসুন্নাহার-এর ছোট মেয়ে শামীম শাহরিয়ার বাংলাদেশ পরিসংখ্যা ব্যুরোতে কর্মরত আছেন।

বেগম শামসুন্নাহার ছিলেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ -এর একজন সক্রিয় সদস্য এবং মিরপুর আস্তানা শরীফের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। ১৯৯৩ সালে তিনি হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ পরিচালিত হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ-এর অধ্যক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মময় স্মৃতিকে ধারণ করে হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ আজ হাক্কানী মিশন মহাবিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে।

বেগম সামসুন্নাহার। আজীবন যে মহীয়সী নারী সাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভেদ করে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে নারী সমাজকে নিয়ে একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেন। জীবন-সায়াহ্নে এসে তিনি ৩১শে মে ২০১১ সালে আজকের এই দিনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আলো-ছায়াময় আনন্দ ঘেরা পৃথিবী থেকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চিরবিদায় নিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গুণী ও সুখ্যাতি মহলে যে অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান রাব্বুল আল আমীনের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করে প্রার্থণা করি তিনি যে তাঁকে জান্নাতের সর্বোত্তম স্থানে প্রেরণ করেন…..আমিন।

লেখক: লোক-সাহিত্যনুরাগী, রাজনীতিক কর্মী ও সংগঠক