শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ড. মুরসি : একজন মজলুম নেতা

news-image

ডক্টর বি এম শহীদুল ইসলামঃ তাহরির স্কয়ারের আকাশ-বাতাস জনতার স্লোগানে মুখরিত। সেদিন বিশ্ব তাকিয়ে ছিল একটি মরুময় ঐতিহাসিক জনপদের আসন্ন বিরাট পরিবর্তনের দিকে। অনেকে ভাবতে শুরু করলেন, হয়তো দীর্ঘ দিনের সামরিক শাসনের অবসানের শেষ ঘণ্টা বাজতে যাচ্ছে এক সময়ে ফেরাউনদের অত্যাচারের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত দেশটিতে। মাত্র ১৮ দিন না যেতেই মানুষের কল্পনা সত্যিই বাস্তবে পরিণত হলো। সে দেশের বিশেষত ধর্মভীরু জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকা সামরিক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের দম্ভ ও নিবর্তনমূলক শাসনব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটল। উল্লাসে ফেটে পড়ল দেশের মুক্তিকামী মানুষ। আনন্দে উদ্বেলিত হলো মিসরের নাগরিক ছাড়াও বিশ্ববাসী। গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা এলো মিসরের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে।

তারপর ৩ জুন ২০১২ সালে বহুল প্রতীক্ষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সব দলের অংশগ্রহণে জনগণের ভোটে সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থনের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনল ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর ঘনিষ্ঠ ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’। এর সুদক্ষ নেতৃত্বে সূচনা হয়েছিল কায়রোর তাহরির স্কয়ারের অগ্নিঝরা আন্দোলন। তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন ইখওয়ানুল মুসলেমিনের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসান আল বান্নার সুযোগ্য উত্তরসূরি ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুরসি।

নির্বাচনী বিজয়ের পর অনেক টালবাহানা শেষে মুরসির নাম ঘোষণা করা হলো মিসরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১২ সালের ২৪ জুন শপথবাক্য পাঠের মাধ্যমে মিসরের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন শুরু করলেন এ সংগ্রামী নেতা। তিনি একাধারে ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেজ, ইঞ্জিনিয়ার, পিএইচডিধারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পার্টির প্রধান। কিন্তু মিসরের ইতিহাসের আরেক ‘ফেরাউন’তুল্য আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি মাত্র ১৩ মাসের ব্যবধানে ২০১৩ সালে তার দেশের প্রেসিডেন্টকে জোর করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মিসরের সর্বময় শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে। অতঃপর তাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে অন্তরীণ করে রাখা হয়। মামলাবাজ সিসির আমলে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসির রায় দেয়া হলো মুরসি ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। পরে ফাঁসির রায় খারিজ হলেও অন্য মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারেই মৃত্যুর নীলনকশা অঙ্কন করা হয় তার। এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে ১৭ জুন। কারাগারে মূলত শহীদ হয়ে গেলেন ড. মুহাম্মদ মুরসি।

বারবার মনে পড়ছে, ২০১২ সালের তাহরির স্কয়ারের সেই আন্দোলনের কথা। কোনো আপনজন মারা গেছে বলে মনে হচ্ছে। কতবার ড. মুরসির কথা আলোচনা করেছি প্রবাসে বন্ধুদের সাথে। মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থানকালে মিসরীয় অনেক ভাইয়ের সাথে ড. মুরসি সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। জানার চেষ্টা করেছি, তার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে। তাদের মতে, ‘ড. মুরসি উচ্চচিন্তার অধিকারী একজন উদারপন্থী সৎ ইসলামী নেতা।’ জামেয়াহ আলরাজির (আলরাজি বিশ্ববিদ্যালয়) একজন মিসরীয় শিক্ষক নাবিল মাসরিকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম- What kind of man Dr. Mohammad Mursi as a Muslim leader? তখন তিনি আরবি ভাষায় বললেন- ‘জাইয়্যিদ জিদ্দান, জাইয়্যিদ জিদ্দান’। অর্থাৎ তিনি মানুষ হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে, মুসলিম নেতা হিসেবে এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে সর্বোত্তম ব্যক্তিত্ব। অতঃপর আমি জানতে চাইলাম- What kind of man Abdul Fattah Sisi? তিনি বললেন- ‘জালিম দ্য গ্রেট, জালিম দ্য গ্রেট’।

আগেই জানা গিয়েছিল, মুরসির পরিবার তার জীবন নিয়ে অনেক শঙ্কায় ছিলেন। ড. মুরসিকে নির্জনে জেলখানার অভ্যন্তরে ধুঁকে ধুঁকে হত্যার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র চলছিল, এ কথা তার পরিবারের সদস্যরা উপলব্ধি করতেন। শেষ অবধি স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হলো। ড. মুরসিকে জেলখানায়ই পরিকল্পিত উপায়ে হত্যা করা হলো। এ মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে না। এটা একটি জুডিশিয়াল মার্ডার। সুদূরপ্রসারী নীলনকশার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হত্যা করা হয়েছে। এমনটি ১৯৩১ সালে করা হয়েছিল ইতালির মুসোলিনির দ্বারা লিবিয়ার ওমর মুখতারকে, মিসরের শহীদ হাসানুল বান্নাকে ও সাইয়েদ কুতুবসহ অনেককে। তবে মুসোলিনির সে সুখ সয়নি বেশি দিন। ১৯৪৫ সালে ইতালির জনগণই তাকে হত্যা করে তার লাশ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রেখেছিল প্রদর্শনের জন্য।

ইসলাম, ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং মুসলমানদের জন্য ড. মুরসি বিশ্বব্যাপী যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। জেলখানায় তাকে প্রতিদিন ২২-২৩ ঘণ্টাই নির্জন কক্ষে বন্দী করে রাখা হতো। তাকে যে খাবার দেয়া হতো, তার বেশির ভাগ থাকত পচা আর বাসি খাবার। খালি মেঝেতে মাদুর বা বিছানা ছাড়াই ঘুমাতে দেয়া হতো। গত কয়েক বছরে ড. মুরসিকে অল্প কয়েকবার তার পরিজনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে মুরসির বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

ব্রিটিশ এমপি ক্রিসপিন ব্ল্যান্ট এবং অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের তদন্তে বেরিয়ে আসে এসব নির্যাতনের চিত্র। তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, কারাগারে নির্যাতন করে বিচারিক কায়দায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুহাম্মদ মুরসিকে। ওই তদন্তের শঙ্কাই সঠিক হলো শেষ পর্যন্ত। ১৭ জুন আদালতে ড. মুহাম্মদ মুরসি বক্তব্য দানকালে প্রথমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তারপর হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি ইন্তেকাল করেন। সুঠাম দেহের অধিকারী ড. মুরসির একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তি নিচে তুলে ধরছি। সেটি ছিল প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার শপথ নেয়ার পরের ঘটনা। ড. মুরসি বলেছিলেন- ‘আমি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি ভবনে এসেছি, আমার পকেটে কোনো পয়সা নেই। যখন চলে যাবো, তোমরা তখন আমাকে পরীক্ষা করে দেখবে, এর চেয়ে বেশি কিছু আমার কাছে পাও কি না। যদি পাও তবে তোমরা বলবে, আমি খেয়ানত করেছি।’

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও মুরসি সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করেছেন। সাধারণ মানুষের সাথে নামাজ আদায় করেছেন। পবিত্র রমজান মাসে তারাবি নামাজে ইমামতি করেছেন। এমন ধর্মপ্রাণ ও যোগ্য নেতৃত্ব বিশ্বে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ড. মুরসির মৃত্যুর পর তার স্ত্রীর প্রদত্ত আবেগময় একটি বক্তব্য তুলে ধরা হলো। তা নিম্নরূপ- ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি আল্লাহর নির্দেশে তার জিম্মায় চলে গেছেন! তিনি এমন অবস্থায় আল্লাহর নিকট চলে গেলেন, যখন তিনি ছিলেন আল্লাহর দ্বীনের একজন সাহায্যকারী, শাহাদতের প্রত্যাশী এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন তার জাতির জন্য একজন সাহায্যকারী। অথচ তার জাতির অনেকেই তার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন সত্যের পতাকাবাহী একজন সৈনিক। সত্যের ব্যাপারে অগ্রগামী। কখনোই তিনি পশ্চাৎগামী ছিলেন না। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি কোনো ধরনের অসত্যের পদলেহন না করে ক্লান্তিহীন ও নিরলসভাবে ছয়টি বছর সত্যের ঝাণ্ডা উড্ডীন করে রেখেছিলেন। তিনি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলেন, যখন তিনি ছিলেন মহান মর্যাদাশালী একজন ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তাকে ভালোবেসে যুগের এ প্রতারণামূলক খেয়ানত এবং হীনতা থেকে মুক্ত করে তার কাছে তুলে নিয়েছেন। আল্লাহ তাকে এমনভাবে তুলে নিয়েছেন, যখন তিনি আমাদের প্রিয় নবী সাইয়েদিনা ইয়াহইয়া ও ঈসা আ:-এর দৃষ্টান্তের মতো এ যুগের মহান দৃষ্টান্ত হতে পারেন। যেমন দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন আসহাবুল উখদুদ ও হাবিবে নাজ্জার। দাওয়াতি কাজ ও আমানতের দায়িত্ব পালনের পর আল্লাহ তার সর্বোত্তম সাথীকে নিজের কাছে সুমহান জান্নাতুল ফেরদাউসে তুলে নিয়েছেন।

হে বিশ্বাসঘাতকের সহচররা! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। অচিরেই তোমাদের এমন বিভীষিকাময় অবস্থা গ্রাস করবে, যা থেকে তোমরা পরিত্রাণ পাবে না। অচিরেই তোমাদের ওপর আপতিত হবে ভয়ঙ্কর আজাব। তোমরা আরো সুসংবাদ গ্রহণ করো যে, কিয়ামত পর্যন্ত যত প্রজন্ম পৃথিবীতে আসবে, তাদের মধ্যে যারা শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, এমন প্রত্যেকের জন্য তোমরা এক শিক্ষা হয়ে থাকবে। এটি ইতিহাসের একটি নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

‘হে শহীদ! আপনি আজ জন্নাত পানে…। আপনার রবের সাথে কত উত্তম ব্যবসাই না আপনি করেছেন। হে শহীদ…’। নাজলা আলী মাহমুদ।

আমেরিকায় অবস্থানকালে ড. মুরসি প্রতিদিন তাহাজ্জুদ নামাজের সময় স্ত্রীকে সাথে নিয়ে মসজিদ পরিষ্কার করতে যেতেন বলে জানা যায়। এটা মুরসির ওই সময়ের একজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আমেরিকা প্রবাসী সৌদি নাগরিক সাঈদ আল গামাদি ওই সময় ছিলেন তার খুব ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। গামাদি টুইটারে লিখেছেন, ‘ড. মুরসি আমার নিকটতম প্রতিবেশী ছিলেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজের আগেই স্ত্রীকে নিয়ে মসজিদে যাওয়া ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। তারা উভয়েই নিয়মিত মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে অংশগ্রহণ করতেন। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তেন। তারপর ফজরের নামাজ আদায় করে মসজিদ ত্যাগ করতেন মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসি। কোনো দিন যদি ওই মসজিদে আজান না হতো, আমরা সবাই তার কথাই স্মরণ করতাম। তিনি তখন আজান দিতেন। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুবাদে কয়েক বছর আমেরিকায় অবস্থান করছিলেন মুরসি। তিনি সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।’

লেখক : আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক ও গবেষক dr.bmshahidulislam@gmail.com

এ জাতীয় আরও খবর

২৪ ঘণ্টার জন্য সিলগালা ধানমন্ডি ক্লাব

বছরে প্রায় তিন হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে নরওয়েতে

আবুধাবি পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

ক্যাসিনো খালেদকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার

ক্যাসিনো পরিচালনাসহ নানা অভিযোগে সমালোচিত নবীনগরের মোমিনুল হক সাঈদ

ফেসবুক ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন জাকারবার্গ

শামীমের ডেরায় মিললো ২ কোটি টাকা, ১৬৫ কোটির এফডিআর চেক

অস্ট্রেলিয়ান সিনেটরের মাথায় ডিম ভাঙা বালক ইলে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে

চট্টগ্রামে গা ঢাকা দিয়েছে জুয়ার আসর পরিচালনায় জড়িতরা

এইচএসসি পাসে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে চাকরির সুযোগ

যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে ইরান

প্রেমিকের সাথে পালানো স্ত্রী, স্বামীকে বললেন ‘টেনশন করোনা’!