বুধবার, ১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ২৯শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে উ*লঙ্গ করে নি*র্যাতন, মোবাইলে ভিডিও ধারণ

news-image

ঠাকুরগাঁওয়ে যৌতুকের জন্য গৃহবন্দি করে স্ত্রীকে উ*লঙ্গ করে নি*র্যাতনসহ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে স্বামী সৈয়দ মাসুদ রানার বিরুদ্ধে। নি*র্যাতিতা গৃহবধূ বর্তমানে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে যৌতুকের দাবিতে প্রায়ই শারীরিক নি*র্যাতন করতো স্বামী মাসুদ রানা। এক পর্যায়ে চেতনা নাশক ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলারও চেষ্টা চালানো হয় আফসানা আক্তার চামেলিকে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেও কোন সুফল পায়নি চামেলির পরিবার। ঘটনার পর পারিবারের পক্ষ থেকে মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে মেয়েকে স্বামীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে দাবি পুলিশের।

নি*র্যাতিতা গৃহবধূ আফসানা আক্তার চামেলি অভিযোগ করেন, প্রায় বছর ১৭ আগে সদর উপজেলা পৌর শহরের রোড বাজার এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে সৈয়দ মাসুদ রানাকে ভালোবেসে নিজের পছন্দে বিয়ে করেন তিনি। প্রথম অবস্থায় তাদের দুই পরিবারের এই বিয়েতে সম্মতি না থাকলেও কিছু দিন পর বিয়ে মেনে নেয় তাদের দুইজনেরই পরিবার। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর যেতে না যেতেই চামেলিকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে স্বামী মাসুদ রানা। এরই মধ্যে তাদের সংসারে জন্ম নেয় দুই ছেলে আহসান হাবিব (১৩) ও নফেল (১০)।

বিয়ের পর দীর্ঘদিন থেকে পরিবারের খুটি-নাটি বিষয় নিয়ে যৌতুকের চাপ সৃষ্টি করে তার উপর মাঝে মধ্যেই নানাভাবে নি*র্যাতন চালাতো মাসুদ। দিনে দিনে নি*র্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মাসুদ তাকে ঘরে আ*টকে রেখে উ*লঙ্গ করে মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নি*র্যাতন চালিয়ে তা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতো। তাতে বাধাঁ দিতে গেলে বেপরোয়া লাঠির আঘাত সইতে হতো তাকে। বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়ে জীবন বাঁচাতে নিজ বাপের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো চামেলি। সর্বশেষ ১৩ জুলাই রাতে তাকে মেরে ফেলার উদ্দ্যেশে বেধরক মা*রপিট করে চেতনা নাশক ওষুধ ও ইনজেকশন দিয়ে গৃহবন্দি করে রাখে মাসুদ। পরে বিষয়টি জানতে পেরে তার মা নূরজাহান হায়াত পুলিশের সহায়তায় তাকে রাতেই উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এর পর থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

চামেলির মা নূরজাহান হায়াত জানান, তার মেয়েকে যৌতুকের জন্য তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের সামনেই প্রায়ই মারপিট ও শারীরিক নি*র্যাতন করতো মাসুদ। নি*র্যাতনের কষ্ট সইতে না পেরে প্রায়ই স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিতো তার মেয়ে চামেলি। এ বিষয়ে মাসুদকে বহুবার নিষেধ করা সত্তেও সে কিছুতেই তা বন্ধ করতো না। উল্টো নি*র্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যেতো।

চামেলির বড় বোন আফরোজা আক্তার বলেন, প্রায়ই মোবাইল ফোনে কল করে নি*র্যাতনের কথা জানাতো আর কাঁদতো চামেলি। প্রায়দিন মাদক সেবন করে বাড়িতে এসে শারীরিক নির্যাতন করে মাসুদ। এছাড়াও বাড়ির বাইরে যেন কেউ শুনতে না পায় সেজন্য মাঝে মাঝে ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে লাঠি দিয়ে বেধরক পেটাতো আর ফোনে তা ভিডিও করতো তার স্বামী মাসুদ। একজন মানুষ কতটা পশু ও অমানুষ হলে এমন কাজ করতে পারে তার জানা নেই। তাই এবিষয়ে সুষ্ঠু বিচার করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চান তিনি।

চামেলির বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আবুল হায়াত জানান, যৌতুকের জন্য মেয়ে চামেলিকে প্রায়ই নি*র্যাতন করে তার স্বামী মাসুদ। নি*র্যাতন সহ্য করতে না পেরে চামেলি বাড়িতে আসলে কিছু দিন পর মাসুদ এসে ক্ষমা চেয়ে আবারো তাকে নিয়ে যেতো। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই আবারো সেই একই ঘটনা ঘটতো। এক পর্যায়ে মেয়ে চামেলি তার সাথে যেতে না চাইলে তাকে সবার সামনেই ছুড়ি দেখিয়ে ভয় দেখাতো মাসুদ। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতো।

আবুল হায়াত অরো জানান, তিনি গরীব মানুষ এই সময়ে বিয়ের এতো দিন পর তিনি যৌতুকের জন্য কোন টাকা দিতে পারবেন না। তাই মেয়েকে নি*র্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে ও তার জীবন বাচাঁতে তিনি মেয়েকে তার কাছে রাখতে চান। আর তার মেয়ের নির্যাতন কারির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

নি*র্যাতনের সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাসুদের বাড়ি রোড বাজার এলাকা ও আকচা মুন্সিপাড়া গ্রামের বেশ কয়েজন প্রতিবেশি জানান, মাসুদ খুবই ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাই তার বিরুদ্ধে সকলেই মুখ খুলতে ভয় পায়।তবে এসব অভিযোগের কথা অস্বীকার করেছেন চামেলির স্বামী মাসুদ রানা।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. প্রভাষ কুমার দাশ জানান, গৃহবধূর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও বিভিন্ন স্থানে ব্যথা রয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, সুস্থ হতে আরো বেশকিছু দিন সময় লাগবে।

সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আশিকুর রহমান জানান, মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহবধূকে ওই দিন রাতে উদ্ধার করে তার মায়ের হেফাজতে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।