বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং ৭ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

দেশব্যাপী বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

news-image

ডেস্ক রিপোর্ট : টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট, সোমেশ্বরী ও কংশসহ অধিকাংশ নদীর পানি বেড়েই চলছে। তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ফলে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, শেরপুর ও সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

এসব জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েন লাখ লাখ মানুষ। তারা থাকা-খাওয়া, প্রাকৃতিক কাজ ও গবাদিপশু নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু সড়ক ও বাঁধে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। শুকনো খাবারের জন্য বন্যার্তদের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ফলে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগবালাই ছাড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতেই বন্ধ হয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্কুলে ঝুলছে তালা। বন্ধ হযেছে পাঠদান।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আবার বন্যার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের আসবাবসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ।

প্রতিনিধি পাঠানো প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো-

নেত্রকোনা
ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বারহাট্টা, আটপাড়া, কলমাকান্দার ও দুর্গাপুর উপজেলার প্রায় ২৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ৪ উপজেলায় অন্তত ৩ শতাধিক গ্রামে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

বড়ওয়ারী-সিধলী,ব ড়ওয়ারী-ফকিরের বাজার সড়ক ও ঠাকুরাকোণা-কলমাকান্দা সড়কসহ গ্রামীণ বেশ কয়েকটি সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং ভাঙন সৃষ্টি হওয়ায় উপজেলা ও জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। আটপাড়া, সদর ও বারহাট্টা উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় পানিবন্দি কেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষজন অসহায় হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাদ্য সংকট।

এদিকে, দুই শতাধিক স্কুলে পানি উঠায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার বন্যার্তদের সব ধরনের সেবা দিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারী ও উপজেলার চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য সহকারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রোববার জেলার বন্যাকবলিত কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্টা উপজেলার ২২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা।

জেলার কলমাকান্দা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, উপজেলার মোট ১৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে বন্যায় প্লাবিত হয়ে যাওয়ায় ১৪৭টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি না কমা পর্যন্ত এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া ৯টি বিদ্যালয় বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে খোলা রয়েছে এবং অন্য ২৫টি বিদ্যালয় স্বাভাবিক রয়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তাহের ভূইয়া জানান, উপজেলার মোট ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টি বিদ্যালয় বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য বিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক থাকলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে আরও বিদ্যালয় প্লাবিত হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বারহাট্টা উপজেলার ১০৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বন্যার কারণে ৭৫টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহী দিলশাদ এলীন। তিনি বলেন, বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্য বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পানি নেমে গেলে বন্ধ বিদ্যালয়গুলোতে আবারো পাঠদান শুরু হবে।

জেলা মৎস্য অফিসার দীলিপ কুমার সাহা জানান, বন্যা কবলিত ও ভারী বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতায় ভেসে গেছে ৮টি উপজেলার ৩ হাজার ৫৩টি পুকুরের প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ১ হাজার ৪শ মেট্রিক টন মাছ।

স্থানীয়রা বলেন, পানিতে ভেসে গেছে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মাছ। তলিয়ে গেছে ১২০ হেক্টর শাক-সবজি, ২০ হেক্টর আউশ ফসল এবং প্রায় ৭০ হেক্টর বীজতলা।

টানা ৭ দিনের মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাতে জেলার কংস-ধনু ও উব্দাখালি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুধুমাত্র পাহাড়ি নদী সোমেশ্বরীর পানি অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রযেছে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম’র সঙ্গে যোগাযোগ। কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর সদর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আপাদত ২০ মেট্রিক টন জিআর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সব ধরনে ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

সুনামগঞ্জ
ভারী বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জে বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ আছে। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সাড়ে তিনশ এর বেশি। মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে আরও শতাধিক। গত ছয় দিন ধরে বন্যা কবলিত হয়ে আছে সুনামগঞ্জ। জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, সদর উপজেলাসহ অনেক এলাকায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। রাস্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি ওঠায় বাধ্য হয়েই পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়েছে। বন্যার পানিতে রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় অভিভাবকেরাও ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।

জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলায় ৩৫৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। এগুলোতে পাঠদান স্থগিত রয়েছে। এর বাইরে আরও ১৮টি বিদ্যালয়ে বন্যার্ত লোকজন আশ্রয় নিয়েছেন। সেগুলোতেও পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমে হাওর এলাকায় এমনিতেই শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে। যেহেতু সব উপজেলাতেই বন্যা হয়েছে, তাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো স্কুল প্লাবিত হলে বা শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকি মনে করলে তারা সেটির পাঠদান স্থগিত করতে পারবেন।

লালমনিরহাট
অবিরাম বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তিস্তা-ধরলাসহ সব নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অপরিবর্তিত রয়েছে।

বন্যার পানিতে জেলার পাঁচ উপজেলার নদী সংলগ্নসহ প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ওই সব এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্যা দুর্গত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষজন পরিবার-পরিজন এবং গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এছাড়াও খাদ্যাভাব, বিশুদ্ধ পানি এবং পোকা-মাকড়ের ভয়সহ নানা সঙ্কটে রয়েছে তারা। বন্যা দুর্গত এলাকার ফসলি জমি, রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। পানির তোড়ে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাইপাস সড়ক ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেখা দিয়েছে নানা পানিবাহিত রোগ। হাজার হাজার একর আমন ধানের বীজ তলাসহ অনেক ফসলী ক্ষেত তিস্তার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বন্যায় ভেসে যাচ্ছে শত শত পুকুরের মাছ। অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।

এদিকে, বন্যার পানি বিদ্যালয়ে ঢোকার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

লালমনিরহাট প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ১৬টি, আদিতমারী উপজেলায় ৮টি, কালীগঞ্জ উপজেলায় ২টি ও হাতিবান্ধা উপজেলায় ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় সাময়িকভাবে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

গাইবান্ধা
গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানির তীব্র স্রোতে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় একশ ফুট ধসে গেছে। এতে বাগুড়িয়া গ্রামের সাত শতাধিক বাড়িঘর এবং ওইসব এলাকার বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

এদিকে, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধার সদর উপজেলার ১১৩টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বন্যার্তরা বিভিন্ন বাঁধ, আশ্রয় কেন্দ্র, স্কুল ও মসজিদ-মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটের সঙ্গে খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। গবাদি পশু-পাখি রাখা নিয়ে পড়তে হয়েছে বিপাকে।

বিদ্যালয়ের মাঠে বন্যার পানি উঠায় শনিবার থেকে ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, রোববার বিকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার, তিস্তার ২০ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে করতোয়া নদীর পানি এখনও বিপদসীমার সামান্য নিচে রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী জানান, গত শুক্রবার থেকে হটাৎ করে বিদ্যালয়ের মাঠ ও ভবনে বন্যার পানিতে উঠতে শুরু করে। একারণে জেলায় ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম ফেরদৌস জানান, জেলায় রোপা আউস ধান ক্ষেত ১৩০ হেক্টর, পাট ৬৭ হেক্টর, আমন বীজতলা ১১ হেক্টর ও শাকসবজি ক্ষেত ৮৫ হেক্টর বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আবদুল মতিন জানান, জেলার ৪টি উপজেলার প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং পানিবন্দি নিরাশ্রয় মানুষের জন্য ৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বন্যা কবলিত ৪ উপজেলায় ২৪০ মেট্রিকটন চাল, নগদ ২ লাখ টাকা, ২ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দেখা দিয়েছে গবাদি পশুখাদ্য সংকট। চারদিকে পানি আর পানি। কোথাও কোনো খালি জায়গা নেই। গবাদিপশু রাখবার মতো উঁচু স্থানও নেই।

জেলার ৯টি উপজেলার চরাঞ্চলের তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫২টি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, রোববার বিকাল ৩টায় চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৭৬ সে.মি., নুনখাওয়ায় ৪০ সে.মি., সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৮১ সে.মি.। তবে কাউনিয়ায় তিস্তার পানি বিপদসীমার ২ সে.মি. কমে বিপদসীমার ২০ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙনে এ পর্যন্ত গৃহহীন হয়েছে এক হাজার ৩১টি পরিবার। ভেঙে গেছে দুটি স্কুল।

এদিকে, সদরের হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব, বাংটুর ঘাট, উলিপুরের চর বজরা ও রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুরহেলান গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে। এই এলাকাগুলোতে বাঁধ মেরামতে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো ২৪ ঘণ্টা নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন জানান, কুড়িগ্রাম-সোনাহাট স্থলবন্দর ও কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কে পানি রাস্তা উঠে যাতে যানচলাচল বন্ধ হতে না পারে সেজন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান জানান, ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন ও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
স্কুলগৃহে, মাঠে ও চলাচলের রাস্তায় পানি ওঠায় কুড়িগ্রামে ২৮৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্কুলের অনেকগুলোর মাঠ চার-পাঁচ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে শিক্ষকদের উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণকে বন্যা মোকাবেলায় সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নীলফামারী
দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস ঘিরে উজানের ঢলের পানির চাপ বাড়ছে। এটি বিধ্বস্ত হলে পাল্টে যেতে পারে তিস্তা নদীর গতিধারা। এমনই আশঙ্কা এলাকাবাসী। উজানের লাগামহীন ঢলের পানি অব্যাহতভাবে ধেয়ে আসায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে অবনতি হচ্ছে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। ভাঙছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পাকা ও কাঁচা সড়ক ডুবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র সূত্র মতে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে রোববার বিকেল ৩টায় বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত শনিবার ও শুক্রবার এই পয়েন্টে ৩৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১৭৭ মিলিমিটার।

এতে ডিমলা উপজেলার তিস্তা চরের গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। ওই সব গ্রামের রাস্তঘাট, ব্রীজ কালভার্ট, হাটবাজার বলতে কিছুই নেই। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া শনিবার রাতে ভারি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝড়ো হাওয়ায় এলাকার অসংখ্য গাছপালা ও ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। তিস্তা নদীর বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়ে ডিমলা উপজেলার ৮৬টি পরিবার বসতঘর ভেঙে অন্যত্র সরে গেছে। এর মধ্যে ঝুনাগাছচাঁপানীতে ৭০ পরিবার, খালিশাচাঁপানী ও টেপাখড়িতে ৫ পরিবার করে ১০ পরিবার, খগাখড়িবাড়িতে ৪ ও পূর্বছাতনাইয়ে ২ পরিবার রয়েছে। এ সকল পরিবারকে সরকারিভাবে দেয়া নৌকায় নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়।

এদিকে, শনিবার ও রোববার দুইদিনে বানভাসিদের মাঝে সরকারিভাবে দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী শুকনা খাবার পাওয়া যাচ্ছে না বলে জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া যে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেই চালও বিতরণ করা নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।

জানা যায়, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর বন্যা আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য ১৫০ মেট্রিকটন চাল, দেড় হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, নগদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। শুকনা খাবারগুলো বিতরণ হলেও এখনও চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়নি।

জনপ্রতিনিধিরা জানান, চালের পরিবর্তে শুকনা খাবার ও নগদ টাকা বিতরণ করা যেতে পারে। বন্যা কবলিত ইউনিয়নগুলোতে চাল বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনও নগদ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়নি।

এদিকে ডিমলা উপজেলায় বন্যায় প্রতিটি ইউনিয়নে মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। মেডিকেল ক্যাম্পগুলোতে খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও জ্বর, সর্দি কাশির ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান সিভিল সার্জন ডা. রণজিৎ কুমার বর্মণ।

ডিমলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন নাহার বলেন , তিস্তার পানিতে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের গ্রাম ও চর এলাকা বন্যা ও ভাঙনের কবলে পড়েছে। আমরা সরকারের দেয়া নৌকায় বানভাসিদের উদ্ধার করছি। এছাড়াও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি।

শেরপুর
টানা বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের পাঁচটি উপজেলার বন্যার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রোববার দিবাগত গভীর রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে এখন প্রায় লাখো মানুষ পানিবন্দি রয়েছে ওইসব উপজেলায়। কিছু জায়গায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে পানিবন্দি মানুষের দাবি, সরকারিভাবে ত্রাণ পাচ্ছেন না তারা। এদিকে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৫ জুলাই) সরেজমিন ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।

বন্যার পানি ওঠায় ঝিনাইগাতী ও শেরপুর সদরের ৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঝিনাইগাতীর সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুন্নবী জানান, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারণে উপজেলার ৩৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আক্রাম হোসেন জানান, গাজীর খামার ও ধলা ইউনিয়নে চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় এবং চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের বেপারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার্তরা আশ্রয় নেওয়ায় এসব বিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা: ঝিনাইগাতী উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ঝিনাইগাতী সদর, ধানশাইল, মালিঝিকান্দা ও হাতিবান্ধা ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে। বিশেষ করে গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থরা। বিভিন্ন এলাকার রোপা আমন ধানের বীজতলা ও সবজি পানিতে নিমজ্জিত এবং কাঁচা ঘর, সেতু ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় দুই শ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বাড়িতে পানি উঠায় চুলা জ্বালাতে পারছেন না প্লাবিত এলাকার মানুষ। শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করছেন তারা। বৃষ্টিপাত না কমলে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছবে।

নালিতাবাড়ী উপজেলা: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ও কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টির পানিতে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান এলাকায় দুটি স্থানে ভোগাই নদীর সাড়ে ৬০০ ফুট বাঁধ ভেঙে সাত গ্রামে প্লাবিত হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতায় সড়ক ডুবে থাকায় এবং বাড়ি ঘরে পানি থাকায় দুইদিন ধরে সাত গ্রামের মানুষ দারুণ কষ্টের শিকার হচ্ছেন।

নকলা উপজেলা: গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের কারণে শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা মৃগী নদীর পানির তীব্র স্রোতে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে বাছুর আলগা দক্ষিণ পাড়া, চকবড়ইগাছি গ্রামের আফাজ উদ্দিন ও আছিয়া বেগমের বাড়ি ঘরসহ বেশি কিছু আবাদি জমি ও চলাচলের রাস্তা নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে। অনেকেই নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাড়ি-ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

বগুড়া
সময় যতো যাচ্ছে বগুড়ায় বন্যা পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। প্রায় প্রত্যক দিনই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম। সোমবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেটি গত রোববার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার প্রায় ৯৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬টিই প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাকি ৩টির মধ্যে ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ১টি মাদ্রাসা রয়েছে।

জানা যায়, পানি ঢুকে পড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে চরবেষ্টিত চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নে। এছাড়া কামালপুর ইউনিয়নে ৫টি, চন্দনবাইশা ও বোহাইলে ৪টি করে ৮টি, কাজলা, হাটশেরপুর, কুতুবপুরে ৩টি করে ৯টি, সারিয়াকান্দি সদর এবং পৌর এলাকায় আরও ২টি করে ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সরেজমিনে যমুনা চরের শিমুল তাইড়, কাজলা, শোনপচা, চালুয়াবাড়িসহ বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি মানুষ আর গবাদি পশু এক জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাস করছে। মাঠের পর মাঠ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যা কবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। রান্না করার জায়গা না থাকায় লোকজন শুকনো খাবার খেয়ে অতি মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক। এসময় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক রায়হানা ইসলাম বলেন, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ অক্ষত আছে। জেলা প্রশাসন বন্যা কবলিত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। এ দিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ১৪২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৫০০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১০ লাখ টাকা এবং ১০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে।

এ জাতীয় আরও খবর