শনিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

হারিয়ে যাচ্ছে নাটোরের কাঁচাগোল্লা

news-image

লিটন হোসেন লিমন,নাটোর প্রতিনিধি : অতিথি আপ্যায়নে বাঙালী পরিবারের জুড়ি নেই। সেই প্রচীনকাল থেকেই অতিথি আপ্যায়নসহ যে কোন সুসংবাদে মিষ্টিমুখ করানোর প্রচলন চলে আসছে। আর সে মিষ্টি যদি নাটেরের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লা হয় তবে তো আগেই মুখে পানি আসবে। নাটোরের কাঁচাগোল্লা সারাদেশের পরিচিত একটি নাম। নিজ দেশ এমন কি বিদেশে এর খ্যাতি রয়েছে। আর কাঁচাগোল্লার সুবাদে নাটোরকে পরিচিত করে তুলেছে অন্যরুপে। কাঁচাগোল্লা এর আকার গোলও নয়, আবার কাঁচাও নয়। তবু এর নাম কাঁচাগোল্লা এ নামেই পরিচিত রয়েছে দেশব্যাপী। শোনা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই নাটোরে কাঁচাগোল্লা তৈরি হয়ে আসছে। ১৭ শতকে রাণীভানীর শাসনামল থেকে কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়ে আসছে। ফলে সুস্বাদু কাঁচাগোল্লা প্রায় আড়াইশ’ বছর ধরে দেশ-বিদেশে ভোজ প্রিয় বাঙালির রসনা তৃপ্ত করে আসছে। তবে ১৭৫৭ সাল থেকে এ মিষ্টি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে।

উপকরণ ঃ কাঁচাগোল্লা তৈরির পদ্ধতি অতি সহজ। ছানা চিনি ও পরিমান মতো ছোট এলাচ। তবে ছানা যত ভাল হবে কাঁচাগোল্লা ততো ভালো হবে। তৈরির নিয়ম পদ্ধতি অনুযায় প্রথমে ছানার পরিমাণ মতো চিনি সামান্য পানিসহ চুলায় তাপ দিলেই চিনির দাগ বা ময়লা কেটে যাবে। কড়াই থেকে যে গাদ তুলে ফেলে দিতে হবে। পরে তার মধ্যে ছানা দিয়ে জাল দিতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ জ্বাল দেয়ার পর এটি যখন দানার মতো হবে, তখন চুলা থেকে কড়াই নিচে নামিয়ে ছোটো এলাচের গুড়া ছড়িয়ে দিলেই পরিপূর্ণ কাঁচাগোল্লা তৈরি হবে। তবে কাঁচাগোল্লা তৈরির প্রক্রিয়া এভাবে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। জানা যায় কোন এক মিষ্টির দোকানে একদিন মিষ্টান্ন বানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ছানাওয়ালা প্রায় মণ খানেক ছানা দিয়ে গেছে যা দিয়ে রসগোল্লা তৈরি করা হবে। এ দিকে বড় বড় কড়াইতে চিনির রস গলানো শেষ হয়েছে। এখন কেবল কারিগর ছানা দিয়ে রসগোল্লার গুটি বানিয়ে গরম চিনির রসে ছাড়বে। কিন্তু কারিগর না আসায় দোকান মালিক বাধ্য হয়ে এক মন ছানার চিনির রস যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য চিনির রসে ঐ ছানা নামিয়ে জ্বাল দিয়ে শুকনা করা হয়। চিনির রসে জ্বাল করা শুকনো ছানা মুখে দিয়ে সকলেই অবাক। দারুন স্বাদ হয়েছে। খরিদ্দাররা এ মিষ্টি পেলে খুব খুশি হবে ফলে এর নাম করণ করা হয় কাঁচাগোল্লা।

তবে প্রাচীন অনেক মিষ্টির দোকান থেকে শোনা যায় কাঁচাগোল্লা তৈরীর সুচনা নাকি এমন ভাবেই হয়েছে। প্রাচীনকালে নাটোরের মিষ্টির দোকানের সংখ্যা ছিলো কম। এর মধ্যে মধুসুদন পাল, রাধাবল্লভ পাল, সারিক কুন্ডু, (যা বর্তমান জয়কালী বাড়ির ননীকুন্ডের মিষ্টির দোকান) প্রাণ হরিপাল, ওপর বাজারের আশুতোষ পাল, নীচাবাজারের মধৃসুদন পাল (বর্তমান দুলাল পালের দোকান) বিনোদ গোসাইয়ের মিষ্টির দোকান ও দিঘাপতিয়ার ভবতারণ সাহা ও পুলিন সাহার মিষ্টির দোকান ছিলো অন্যতম। এ সমস্ত দোকানে বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা ছাড়াও অবাক সন্দেশ, রাঘব শাহী সন্দেশ, চমচম, রাজভোগ, রসকদম, ক্ষিরতক্তি, রসমালাই, পানতোয়া প্রভৃতি মিষ্টি ছিল অন্যতম। তবে এ সব মিষ্টির মধ্যে কাঁচাগোল্লাই ছিলো সবচে শীর্ষে। ফলে সে সময় বিখ্যাত এ কাঁচাগোল্লা রাজা-জমিদারের বাড়িতে মিষ্টমুখে ব্যবহৃত হতো। এমনকি বিলেতের রাজ পরিবার পর্যন্ত যেত। আরো যেতো ভারতবর্ষের সর্বত্র। এমনকি শোনা যায় কুঁচবিহারের মহারাজা বাড়ি, মুর্শিদাবাদের নাবাব বাড়িসহ বিভিন্ন সম্মানিত মহলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত হতো কাঁচাগোল্লা। বর্তমানে দেশের রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নাটোরের কাঁচাগোল্লা নিয়ে যেতে কেউ ভুল করে না। পূর্বে কাঁচাগোল্লার মূল্য কত ছিল এ সম্পর্কে ধারণা দেয়ার মতো কেউ না থাকলেও জানা যায় ১৯২৮ সালে প্রতি সের কাঁচাগোল্লার মূল্য ছিলো ২ আনা। ১৯৪০ সালের পর থেকে এ মিষ্টির মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বর্তমানে নাটোরের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে প্রতি কেজি কাঁচাগোল্লা ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কারণ পূর্বে কাঁচাগোল্লার যে মান ছিলো তা আর বর্তমানে নেই। সময়ের চাহিদা অনুসারে প্রতিটি দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী মিষ্টি ব্যবসায়ী ১০০/১৫০ টাকা কেজি দরে ছানা ক্রয় করে এর মধ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করে ক্রেতা সাধারণকে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে। এমনকি নাটোর যোগাযোগের দিক থেকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হওয়ায় প্রতিদিন রেল, বাস সহ বিভিন্ন যানবাহনে শ’ শ’ যাত্রী সাধারণ চলাচল করে। ফলে বাসষ্ট্যান্ড ও রেল ষ্টেশনে এক শ্রেণীর প্রতারক সুজি মিশ্রিত ভেজাল কাঁচাগোল্লা বিক্রি করে যাত্রী সাধারণকে ঠকাচ্ছে। বাস টার্মিনাল ও রেল স্টেশসে এসব মিষ্টি বিক্রেতাদের প্রবণতা সবচে বেশী।

নাটোরের বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে যেখানে প্রতিদিন ১৫ মণ কাঁচাগোল্লা তৈরি করা হতো। বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ৮ থেকে ১০ মণ করে তৈরি হচ্ছে। নীচাবাজারের দুলাল পালের মিষ্টির দোকান পূর্বে ৫০/৬০ কেজি ছানার মিষ্টি ও প্রায় ২ মণ কাঁচাগোল্লা হতো। অথচ ছানার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মিষ্টি তৈরির প্রবণতা অনেক কমে এসেছে। তবুও এখানো নাটোরের ৫/৭ টি দোকানে গুনগতমান ঠিক রেখে কাঁচাগোল্লা তৈরি করে কাঁচাগোল্লার অতীত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে মৌচাক, লাল বাজারের কালিবাড়ি, নীচাবাজারের দুলাল পাল ও কুন্ডুর দোকানসহ কয়েকটি দোকানে এখানো ভালো মানের কাঁচাগোল্লা পাওয়া যায়।

নাটোরের ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির দেশব্যাপী এখনো খ্যাতি রয়েছে। জনশ্রুতি আছে দিঘাপতিয়ার রাজা প্রসন্ন নাথের আমলে ঝুলনের দিনে উপস্থিত জনসাধারনের প্রতিজনকে এক বেলচা করে কাঁচাগোল্লা দেয়া হতো। এছাড়া নাটোর রাজ ষ্টেটের ছোটো তরফের রাজা বীরেন্দ্রনাথ রায়ের কাঁচাগোল্লা খুব প্রিয় ছিলো। মহারাণী ভবানীর দত্তক পুত্র রাজা রামকৃষ্ণের আমলেও কাঁচাগোল্লর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে বলে জানা যায়। ফলে নাটোরের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লার গুনগতমান ঠিক রেখে কাঁচাগোল্লা তৈরি না করলে মানুষের ভেতরে স্থাপিত একটি বিশ্বাস একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য যা লালন করছে মানুষ শ’ শ’ বছর ধরে, তা অচিরেই হারিয়ে যাবে। দেশের অনেক অঞ্চলের এ ধরনের ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে কতিপয় অসাধুদের জন্য। সে জন্য এই ঐতিহ্যকে লালন করার স্বার্থেই বিখ্যাত এ মিষ্টিতে যাতে কেউ ভেজাল দ্রব্য মিশাতে না পারে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের সৃদৃষ্টি দেয়া উচিত।