শনিবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি : চটেছেন ট্যানারি মালিকরা

news-image

নিউজ ডেস্ক : সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেওয়ায় চটেছেন ট্যানারি মালিকরা। কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের পর মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ট্যানারি মালিকরা জরুরি বৈঠক করেছেন। তারা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের চামড়া শিল্পকে বিপদে ফেলবে। এর আগে মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) কাঁচা চামড়ার উপযুক্তমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা দিতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত হবে অনেকটা আত্মঘাতী। কারণ, কোরবানি চামড়া দিয়েই মূলত আমাদের ব্যবসা করতে হয়। কোরবানির কাঁচা চামড়া যদি রফতানি হয়, তাহলে আমাদের শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো কি করবে? তিনি বলেন, আর আমরা তো এখনও চামড়া সংরক্ষণ করা শুরুই করিনি।

আরও ৮ থেকে ১০ দিন পর আমরা চামড়া কেনা শুরু করবো। আর মধ্যস্বত্বভোগীদের তৈরি করা সমস্যা আমাদের ওপর কেন চাপানো হবে? আমরা তো সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই চামড়া কিনবো। আমরাতো কম দামে চামড়া নেবো না। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়বে। এ নিয়ে ট্যানারি মালিকরা জরুরি বৈঠক করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল বুধবার (১৪ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলেও জানান বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক।

প্রসঙ্গত, গত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়া।
মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার দাম দিয়েছেন ২শ’ টাকারও কম। এক লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩শ’ টাকায়। চামড়ার দাম না পাওয়ায় কোরবানি দাতাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে চামড়া মাটিতেও পুঁতে দিচ্ছেন। তবে কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাওয়ার জন্য ট্যানারি মালিকরা মধ্যস্বত্বভোগীদেরকে দায়ী করেছেন। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের তৈরি করা কৃত্রিম সংকটের কারণে এবার কাঁচা চামড়ার দাম কমে গেছে।

এদিকে গতকাল সোমবারের (১২ আগস্ট) মতো আজ মঙ্গলবারও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে। একইভাবে গতকালের মতো আজও স্যায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা পাইকারদের কাছে মাত্র ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকায় চামড়া বিক্রি করছেন।

অন্যদিকে, পোস্তা ও হাজারীবাগ এলাকাতেও পাইকার, ট্যানারি প্রতিনিধি ও আড়তদাররাও অল্প দামে কোরাবানির পশুর চামড়া কিনছেন। ঢাকার বাইরে থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যে দামে চামড়া কিনেছেন তার চেয়েও কম দামে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
উল্লেখ্য, এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা

এ প্রসঙ্গে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের কাছে যখন টাকা ছিল, তখন আমরা প্রতিযোগিতা করে চামড়া কিনেছি। ফলে তখন কাঁচা চামড়ার দাম বেশি হতো। এবার আমাদের কাছে টাকা নেই। ট্যানারি মালিকরা সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার বেশি বকেয়া রেখেছেন। টাকা না থাকলে আমরা কিনবো কিভাবে? তিনি বলেন, মৌসুমী ব্যবসায়ী ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার অথবা যে কোনোভাবেই হোক তারা এবার অল্প টাকায় কাঁচা চামড়া কিনেছেন। এবার প্রতিযোগিতা করার মতো লোক ছিল না। এ কারণে চামড়ার দাম পড়ে গেছে। তাদের হাতে টাকা না থাকার কারণে এবছর ২৪৫ জন আড়তদারের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন আড়তদার চামড়া কিনতে পারছেন বলেও জানান তিনি।

ধর্মীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, কাঁচা চামড়া বিক্রির টাকা কোরবানিদাতারা গরিব-মিসকিন ও এতিমদের মধ্যে দান করে থাকেন। কিন্তু, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্যের বাজার চড়া থাকলেও এবছর সরকারিভাবে কাঁচা চামড়ার দাম গত বছরের দরেই নির্ধারিত হয়েছে। এরপর কাঁচা চামড়া কেনার পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই ‘টাকা নেই’, ‘বেশি দামে চামড়া কিনলে বেচতে পারবেন না’, ‘সংরক্ষণ করার প্রস্তুতি রাখুন’, ‘চামড়া পচে যেতে পারে’ ইত্যাদি হুজুগ তোলায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন প্রায় বিনামূল্যে। ফলে চামড়ার দাম একেবারেই পড়ে যাওয়ায় কোরবানিদাতার দানের টাকার পরিমাণ গেছে কমে। ফলে চামড়া ব্যবসায়ে জড়িত সবাই লাভবান হলেও বঞ্চিত হয়েছেন কেবল এতিম ও দুস্থরা। তাদের প্রাপ্য অংশ এবার ভয়াবহভাবে কমে গেছে। বাংলা ট্রিবিউন