রবিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং ৫ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মেয়েদেরও খৎনা দেয়া হয়! জেনে নিন কতটা অমানবিকভাবে খৎনা দেয়া হয় নারীদের

news-image

‘আমার চোখ বেধে দুই হাত পেছনে শক্ত করে বাধা হয়। দুই পা দু’দিকে মেলে ধরে যৌ’নাঙ্গের বাইরের চামড়া দু’টি শক্ত করে পিন কিছু দিয়ে আটকে দেয়া হয়।’ দুঃসহ এমনই এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন বিশারা নামের এক নারী।  তিনি নারী খৎনার সম্মুখীণ হন। তার অভিজ্ঞতার আলোকেই জেনে নিন কতটা অমানবিকভাবে খৎনা দেয়া হয় নারীদের। ‘আমি তীক্ষ্ণ একটি ব্যথা অনুভব করে চিৎকার করতে থাকি। আমার আর্তনাদে কেউ সাড়া দেয়নি। আমি লাথি মেরে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলাম। দানবের মতো কেউ একজন আমার পা চেপে ধরে ছিল।’

বিশারা বলেন, এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। অন্য সব মেয়েদেরও একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। ব্যথা নিরাময়ের জন্য ছিল শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি ভেষজ ওষুধ। একটি ছাগলের মতো করে তারা আমার দুই পা টেনে ধরে ক্ষত স্থানে সেই ভেজষ ওষুধ মাখিয়ে দেয়। এভাবেই প্রত্যেক নারীকে খৎনা দেয়া হয়।

মেয়েদেরও খৎনা হয়! এ বিষয়ে অনেকেই অবগত নন! সত্যিই এমন প্রথা রয়েছে বিশ্বের কয়েকটি দেশে। আফ্রিকা মহাদেশের ২৭টি দেশসহ ইন্দোনেশিয়া, ইরাকের কুর্দিস্তান, ইয়েমেন-এই দেশগুলোতে নারীদের মুসলমানি একটি ধর্মীয় রীতি হিসেবেই প্রচলিত। আজ থেকে নয়, আধুনিক বিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার প্রায় শতবর্ষ আগে থেকেই এই রীতি মেনে আসছেন বহু মানুষ। আর সংখ্যাটাও একেবারেই নগণ্য নয়!

বিশ্বের প্রতিটি ২০জন মেয়ে শিশু বা নারীর মধ্যে একজনের খৎনা করা হয়ে থাকে, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় এফিএম বা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন। বর্তমান বিশ্বে এরকম বিশ কোটি নারী রয়েছেন, যাদের আংশিক অথবা পুরো খৎনা অর্থাৎ যৌ’নাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে। অনেক নারী ও মেয়ের শিশু অবস্থাতেই এরকম খৎনা করা হয়, এমনকি শিশুদেরও।

অনেক সময় বয়ঃসন্ধির সময় এটি করা হয়। ফলে নারীদের শা’রীরিক এবং মানসিক সমস্যার তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাদের সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ২৯টি দেশে ব্যাপকভাবে এই রীতি চালু রয়েছে, যদিও এদের মধ্যে ২৪টি দেশেই এটি নিষিদ্ধ। এমনকি, নারীদের এরকম যৌ’নাঙ্গ ক’র্তন বন্ধের আহবান জানিয়ে প্রতিবছরের ৬ই ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ দিবস হিসাবে পালন করে জাতিসংঘ।

উল্লেখ্য, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই মুসলমানি প্রথা বিশ্বের সর্বত্রই প্রচলিত কিন্তু নারীদের মুসলমানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অনেক ‘আধুনিক দেশ’। এমনকি এই প্রথার ব্যবহারিক প্রয়োগে কড়া শাস্তি হবে প্রয়োগকারীর এমন ব্যবস্থাও নিয়েছে দেশের সরকার। কমিউনিস্ট দেশ রাশিয়া সেই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি।

নারীদের খৎনা আসলে কী?

নারীদের খৎনার মানে হলো ইচ্ছাকৃতভাবে মেয়েদের যৌ’নাঙ্গের বাইরের অংশটি কেটে ফেলা। অনেক সময় ভগাঙ্কুর এর পাশের চামড়া কেটে ফেলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছে, চিকিৎসার প্রয়োজন ব্যতীত এমন যেকোনো প্রক্রিয়া, যা নারীদের যৌ’নাঙ্গের ক্ষতি করে থাকে। এ ধরণের কাজে নারীদের শা’রীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতি করে থাকে, যার স্বাস্থ্যগত কোন উপকারিতা নেই।

নারীদের জন্য উদ্বেগ এবং তাদের পরবর্তী সম্পর্কের ওপর মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে এই বিষয়টি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা জোর করে এটি করা হয়ে থাকে। যদিও মেয়েদের এরকম খৎনা অনেক দেশেই বেআইনি, তবে দক্ষিণ আফ্রিকা, এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশি এটি করা হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যেও এটি প্রচলিত আছে।

মেয়েদের ক্ষেত্রে চার ধরণের খৎনা-১. ভগাঙ্কুর এবং আশেপাশের চামড়ার পুরোটাই বা আংশিক কেটে ফেলা ২. ভগাঙ্কুর, যৌ’নাঙ্গের বাইরের বা ভেতরের চামড়া অপসারণ করে ফেলা ৩. যৌ’নাঙ্গের বাইরের বা ভেতরের অংশের চামড়ার অংশটি কেটে ফেলে পুন:স্থাপন করা।

যৌ’নাঙ্গের বাইরের এবং ভেতরের চামড়া কেটে এমনভাবে পুনঃ স্থাপন করা হয়, যাতে শুধুমাত্র মূত্র ত্যাগের জন্য ছোট একটি ফাঁকা থাকে। এতে অনেক সময় নারীদের নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় এই ফাঁকা জায়গাটি এতো ছোট হয়ে থাকে যে, যৌন মিলনের জন্য পরবর্তীতে আবার কেটে বড় করতে হয়। অনেক সময় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৪. ওপরের তিনটির বাইরে ভগাঙ্কুরের বা যৌ’নাঙ্গের সবরকম কাটা ছেড়া বা ক্ষত তৈরি করা।

নারী খৎনার ইতিহাস-খ্রীষ্টজন্মেরও দু-আড়াই হাজার বছর পূর্বে মিশরে পুরুষের খতনার প্রাচীনতম নিদর্শন সম্পর্কে জানা যায়। তখনকার আমলে মিশরীয়দের পক্ষে পাথরে খোদাই বা ছবির মাধ্যমে এই সংক্রান্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে রাখা সম্ভব ছিল। তবে সোমালিয়া বা অন্যান্য অঞ্চলে অত উন্নত শিল্পচর্চাও ছিল না আর কাঠ-মাটির ভাস্কর্য এতদিন টেঁকার কথাও না। তাই মিশরেই নারী-খতনা ও পুরুষ খতনা দুই রকমেরই প্রাচীনতম ইতিহাস পাওয়া যায়।

সেই বিখ্যাত গ্রীক পর্যটক হেরোডোটাসও মিশর ঘুরে লিখেছেন, তাদের মধ্যে এই প্রচলনের কথা। শুধু মিশরই নয়, সারা সাব-সাহারান আফ্রিকা, মানে ইথিওপিয়া ইত্যাদি। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইজরায়েল এসব জায়গাতেও এর প্রচলন ছিল। হিব্রু বাইবেলের গল্পেও তাই পাওয়া যায় ঈশ্বরের আব্রাহামকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেয়ার কথা। তবে এদের মধ্যে এমন অনেক জাতি ছিল যারা ছেলেদের ক্ষেত্রে করলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে খতনা প্রথা অনুসরণ করত না। অন্যদিকে, ইউরোপীয় জাতিগুলো যেমন- গ্রীক, রোমান এরা খতনা পালন করত না। আর মিশরীয়দের এই অভ্যাস তারা ভালো চোখেও দেখত না।

এই প্রথার উৎপত্তি আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলে ঠিক কোন সময় হয়েছে তার সঠিক ধারণা নেই। মূলত, অভিবাসনের কারণেই বিভিন্ন স্থানে এই রীতির প্রচলন ঘটেছে। কারণ ইউরোপ মধ্যএশিয়া ইত্যাদি অন্য কোথাওই এই প্রথা দেখা যায় না। তাই তৎসম বাংলায় এর কোনো প্রতিশব্দ নেই। এই প্রথা শুরু করার পেছনে কারণ কী ছিল? তা নিয়ে গবেষকদের নানা মত।

কেন এটি করা হয়?-নারীদের খৎনার পেছনে যেসব কারণ মূলত কাজ করে: সামাজিক রীতি, ধর্ম, পরিছন্নতার বিষয়ে ভুল ধারণা, কৌমার্য রক্ষার একটি ধারণা, নারীদের বিয়ের উপযোগী করে তোলা এবং পুরুষের যৌন আনন্দ বৃদ্ধি করার মতো বিষয়। অনেক সংস্কৃতিতে নারীদের খৎনাকে মেয়েদের সাবালিকা হয়ে ওঠা মনে করা হয়। এটিকে অনেক সময় বিয়ের পূর্বশর্ত হিসাবেও দেখা হয়।

যদিও পরিছন্নতার বা স্বাস্থ্যগত কোনো সুবিধা নেই। তবে এ ধরণের রীতিতে অভ্যস্ত সমাজগুলোর মানুষেরা মনে করেন, যেসব মেয়েদের এরকম খৎনা করা হয়নি, তারা তারা অস্বাস্থ্যকর, অপরিছন্ন বা গুরুত্বহীন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এটি করা হয় এবং বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি নারীদের বিরুদ্ধে একটি সহিংস আচরণ। নারীদের জন্য উদ্বেগ এবং তাদের পরবর্তী সম্পর্কের ওপর মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে খৎনার বিষয়টি।

ধর্মীয় রূপ-ইসলাম ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মই ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক নারী খৎনার চর্চার শিকার। খ্রিস্টপূর্ব ১৬৩ অব্দের একটি গ্রিক প্যাপিরাসে উলেস্নখ আছে যে, মিশরীয় মেয়েদের খৎনার ভিতর দিয়ে যেতে হতো এবং এটা ব্যপকভাবে স্বীকৃত যে এটির জন্ম হয়েছিল ফারাওদের আমলে মিশর ও নীল উপত্যকায়। মমি থেকে প্রাপ্ত প্রমাণেও টাইপ ১ ও ৩ নারী খৎনা থাকার প্রমাণ মেলে।

এখনো নারী খৎনার চর্চার বিস্তৃতি সম্মন্ধে কিছু জানা যায় না। তবে এই প্রক্রিয়াটির চর্চা এখন মুসলিম, খ্রিস্টান ও সর্বপ্রাণবাদীদের মধ্যে আছে। যদিও নারী খৎনার চর্চা কিছু বিশেষ ধর্মীয় উপ-সংস্কৃতিতে হয়, তারপরও প্রাথমিকভাবে ধর্মকে ছাপিয়ে নারী খৎনা একটি সাংস্কৃতিক চর্চা। ইউনিসেফের তথ্যানুসারে, কোনো ধর্মেই নারী খৎনা বিষয় তথ্যের কোনো সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। এমনকি পবিত্র কোরআন শরীফে এ বিষয়ক কোনো তথ্য নেই।

কোথায় এ রীতি চালু আছে?-বর্তমানে আফ্রিকার অনেক এলাকায়, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু অংশে এই রীতি চালু আছে। তবে অভিবাসনের মাধ্যমে এর চর্চা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু ঐতিহ্যমনা পরিবার তাদের মেয়েদের খৎনার ভেতর দিয়ে যেতে হয় যখন তারা তাদের মাতৃভূমিতে ছুটিতে যায়। যেহেতু পশ্চিমা সরকার নারী খৎনার ব্যপারে খুব সচেতন, তাই তাদের আইনগুলো বহুদেশে নারী খৎনাকে আইনের লঙঘন হিসেবে সাব্যাস্ত করতে সাহায্য করেছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ২৯টি দেশে ব্যাপকভাবে এই রীতি চালু রয়েছে, যদিও এদের মধ্যে ২৪টি দেশেই এটি নিষিদ্ধ। খালিদ আদেম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ব্যক্তি যাকে ২০০৬ সালে তার কন্যাকে খৎনা করানোর জন্য শাস্তি প্রদান করা হয়।অনেকে দেশে বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সাজা হতে পারে, এরকম আশঙ্কা থেকে ভুক্তভোগীরা আর অভিযোগ সামনে আনেন না। তবে মেয়ে শিশুদের ওপর এরকম খৎনা করার প্রবণতা বাড়ছে। এসব শিশুরা স্কুলে না পড়ায় বা যথেষ্ট বড় না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সহজে সনাক্ত করতে পারেন না।

সম্প্রতি রাশিয়ায় একটি বিল আনা হয়েছে, যেখানে মহিলাদের মুসলমানিকে (FGM- Female Genital Mutilation) একটি আইনি অপরাধ হিসেবেই দেখা হবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, শাস্তি হতে পারে দশ বছরের কারাবাস। রাশিয়ার পার্লামেন্টে এই বিলের সপেক্ষে বলা হয়, সভ্য সমাজে নাপরী যৌ’নাঙ্গের অঙ্গহানি বা নারীদের মুসলমানির মত বর্বর প্রথার কোনো স্থান নেই।

এ জাতীয় আরও খবর

র‍্যাবের অভিযানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইয়াবা ও ফেন্সিডিলসহ আটক ৩

ভোলায় নিহতের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মহাসড়কে অ্যালকোহল ডিটেক্টর চালু

রংপুর জেলা পরিষদ সিটি সেন্টার পরিদর্শনে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিআইজি

১৭ বছর পর গঠিত কমিটি বাতিল করলেন জাপা’র চেয়ারম্যান

নির্দোষ কাউন্সিলরদের কোনোভাবেই হয়রানি না করার অনুরোধ মেয়র খোকনের

বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ৪, গুলিবিদ্ধ ৯

১০ টাকার চাল বিতরণে ১৯ ধরনের অনিয়ম, রংপুরের শানেরহাট ইউপিতে খাদ্যবান্ধব  কর্মসূচির নামে নজিরবিহীন দুর্নীতি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

ছক্কা মেরে রোহিত শর্মার ডাবল সেঞ্চুরি

ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলা

পাল্টাপাল্টি হামলায় ভারতের ৯ ও পাকিস্তানের ৭ জন নিহত