রবিবার, ১৭ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জোহর ও আসর নামাজে কিরাত আস্তে পড়ার কারণ

news-image

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যেসব নামাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কিরাত শুনিয়ে পড়েছেন আমরাও সেসব নামাজে তোমাদেরকে কিরাত শুনিয়ে পড়ি। আর যেসব নামাজে কিরাত নীরবে পড়েছেন আমরাও সেসব নামাজে কিরাত নীরবে পড়ি। (সুনানে নাসায়ী, হাদিস ৯৭০)
জোহর আসর নামাজে কিরাত আস্তে আর মাগরিব, এশা এবং ফজরের নামাজে কিরাত জোরে পড়া হয় যে কারণে:

শরীরের যে অঙ্গ দিয়ে ময়লা বের হয়, তা পরিস্কার করে নামাজ আদায় করতে হয়। কিন্তু বাতকর্ম পেছনের রাস্তা দিয়ে করলেও তা পরিস্কার না করে হাত পা, মুখ পা ইত্যাদি ধৌত করে ওজু করতে হয় কেন?

আপনি কি এমন উদ্ভট প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন….?

আসলে এর জবাব একটাই। আল্লাহর আদেশ। ব্যস। আমরা মেনে নিয়েছি। তেমনি জোহর ও আসরের নামাজে কিরাত আস্তে পড়া আর মাগরিব, এশা এবং ফজরের নামাজে কিরাত জোরে পড়া এটাই রাসূল (সা.) এর আমল দ্বারা প্রমানিত। তাই সকল মুসলমানদের জন্য এভাবে আমল করার বিধান। কেন এই বিধান তা জানার কোনো প্রয়োজনই নেই।

আর মৌলিকভাবে এর কোনো কারণও নেই। বাকি একটি হিকমত এই ছিল যে, দিনের বেলা জোরে কিরাত পড়লে আরবের মুশরিকরা কিরাতকে ঠাট্টা করে জোরে জোরে আওয়াজ করে বিরক্ত করত। যা রাতের বেলা হত না। তাই দিনে আস্তে কিরাতের বিধান এসেছে আর রাতে জোরের।

বাকি এটি কেবলি একটি হিকমত। মূলত আল্লাহর নবী (সা.) এভাবে নামাজ পড়েছেন, তাই আমরা এভাবে নামাজ পড়ি।

আরো একটি হিকমত বলা হয়ে থাকে, দিনের বেলা সূর্যের তীব্র প্রখরতার মাধ্যমে আল্লাহর জালালিয়্যাতের প্রকাশ করে থাকে। আর জালালিয়্যাত প্রকাশিত হলে মানুষ চুপ হয়ে যায়, তাই ইমামও আস্তে কিরাত পড়ে। আর রাতে বেলা চাঁদের স্নিগ্ধতার মাধ্যমে আল্লাহর জামালিয়্যাত এর জানান দেয়, আর জামালিয়্যাত সত্তার সামনে সবাই কথা বলে উঠে। তেমনি রাতের বেলার মুসল্লি জোরে কিরাত পড়ে থাকে।

আবারো বলছি এসবই মানুষের গবেষণা করা হিকমত। আল্লাহর আদেশ ও রাসূল (সা.) এর তরীকার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহর নবী যে নামাজে জোরে কিরাত করেছেন, আর যে নামাজে আস্তে কিরাত পড়েছেন, তা-ই আমাদের জন্য মানা আবশ্যক। হিকমত বা কারণ খোঁজা নিরর্থক।

ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻲ ﻣَﻌْﻤَﺮٍ، ﻗَﺎﻝَ : ﺳَﺄَﻟْﻨَﺎ ﺧَﺒَّﺎﺑًﺎ ﺃَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻳَﻘْﺮَﺃُ ﻓِﻲ ﺍﻟﻈُّﻬْﺮِ ﻭَﺍﻟﻌَﺼْﺮ؟ِ ﻗَﺎﻝَ : ﻧَﻌَﻢْ، ﻗُﻠْﻨَﺎ : ﺑِﺄَﻱِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﺮِﻓُﻮﻥَ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺑِﺎﺿْﻄِﺮَﺍﺏِ ﻟِﺤْﻴَﺘِﻪِ »

হজরত আবু মামার (রহ.) হজরত খাব্বাব (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূল (সা.) যোহর ও আসরে কিরাত পড়তেন কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ পড়তেন। আবু মামার পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কীভাবে বুঝা যেত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূল (সা.) এর দাড়ি নড়াচড়া দেখে বুঝা যেত। (বুখারী, হাদিস নম্বর-৭৬০)

ﻋَﻦْ ﻣُﺤَﻤَّﺪِ ﺑْﻦِ ﺟُﺒَﻴْﺮِ ﺑْﻦِ ﻣُﻄْﻌِﻢٍ، ﻋَﻦْ ﺃَﺑِﻴﻪِ، ﻗَﺎﻝَ : ﺳَﻤِﻌْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ : ‏« ﻗَﺮَﺃَ ﻓِﻲ ﺍﻟﻤَﻐْﺮِﺏِ ﺑِﺎﻟﻄُّﻮﺭِ »

হজরত মুহাম্মদ বন যুবায়ের বিন মুতয়িম (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল (সা.)-কে মাগরিব নামাজে সূরা তূর পড়তে শুনেছেন। (বুখারী, হাদিস নম্বর-৭৬৫)

ﺍﻟﺒَﺮَﺍﺀَ : ” ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﻔَﺮٍ ﻓَﻘَﺮَﺃَ ﻓِﻲ ﺍﻟﻌِﺸَﺎﺀِ ﻓِﻲ ﺇِﺣْﺪَﻯ ﺍﻟﺮَّﻛْﻌَﺘَﻴْﻦِ : ﺑِﺎﻟﺘِّﻴﻦِ ﻭَﺍﻟﺰَّﻳْﺘُﻮﻥِ

হজরত বারা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) এক সফরে এশার দুই রাকাতের এক রাকাতে সূরা তীন পড়তেন। (বুখারী, হাদিস নম্বর-৭৬৭)

জোহর ও আসরের নামাজে কিরাত আস্তে পড়তে হয় কেন মুফতি তাজুল ইসলাম-

জোহর ও আসরের নামাজে নিচু আওয়াজে আর মাগরিব, এশা এবং ফজরের নামাজে উঁচু আওয়াজে কিরাত পড়ার বিধান খুবই যুক্তিসংগত। এই বিধান আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরত ও হিকমতের প্রমাণ বহন করে। কেননা মাগরিব, এশা ও ফজরের সময় লোকেরা কাজকর্ম, কথাবার্তা ও আওয়াজ থেকে নীরব থাকে এবং এ সময় পরিবেশ নীরব ও শান্ত থাকে। তা ছাড়া এ সময় চিন্তা-ফিকিরও কম থাকে, তাই এ সময়ের কিরাত অন্তরে বেশি প্রভাব সৃষ্টি করে। কেননা অন্তর চিন্তা-ফিকির থেকে মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন হওয়ার কারণে এবং কানে শব্দ না আসার কারণে অনুধাবন ও শ্রবণ করতে আগ্রহী হয়। আর রাতের বেলা কথা কান অতিক্রম করে অন্তরে গিয়ে প্রবেশ করে এবং পূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই ইবাদতের জন্য রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।’ (সূরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৬)

এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে মিষ্টকণ্ঠের মানুষ ও পাখির আওয়াজ দিনের তুলনায় রাতে অনেক সুন্দর এবং প্রভাবান্বিত হয়। এ জন্য এ সময় উঁচু আওয়াজের কিরাত নির্দিষ্ট হয়েছে।

আর জোহর ও আসরের নামাজে নিচু আওয়াজে কোরআন পড়ার হিকমত হলো, দিনের বেলা হাট-বাজারে ও বাড়ি-ঘরে শোরগোল থাকে, বিভিন্ন আওয়াজ ও চিন্তা-ফিকিরের কারণে অন্তর বেশি ব্যস্ত থাকে এবং কথার প্রতি মনোযোগ থাকে না। তাই এ সময় উঁচু আওয়াজে কিরাত নির্দিষ্ট হয়নি। আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে এদিকে ইঙ্গিত করে বলেন—‘নিশ্চয়ই দিবাভাগে রয়েছে আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা।’ (সূরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৭)

এ জাতীয় আরও খবর