বৃহস্পতিবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভাঙছে সুন্দরবন

news-image

ভাঙনে ছোট হচ্ছে সুন্দরবন। পশ্চিম সুন্দরবনের শিবসা নদীর পাড়ে এই ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর প্রায় ১২ থেকে ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে ভাঙন। ভাঙনে ওই অংশের বড় বড় সুন্দরী, গেওয়াসহ বিভিন্ন গাছ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সুন্দরবন ঘুরে ভাঙনের এসব চিত্র দেখা গেছে। স্থ্থানীয় জেলে ও বনকর্মীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে নদী ভেঙে বনের ১৫ থেকে ২০ ফুট এলাকা বিলীন হয়েছে।

তবে বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে ভাঙনের এই দৃশ্য স্বাভাবিক। প্রাকৃতিকভাবে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এই বন তৈরি হয়েছে। তবে ভাঙনে বনের কত অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে, সেই তথ্য নেই বন বিভাগের কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধির বিষয় নিয়েও কোনো জরিপ চালায়নি বন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি।

৮ অক্টোবর সুন্দরবন ঘুরে দেখা গেছে, নলিয়ান ফরেস্ট অফিস হয়ে শিবসা নদী দিয়ে সুন্দরবনে ভেতরে ১৫ কিলোমিটার প্রবেশের পর নদীর পূর্বপাড় থেকে ভাঙন শুরু। শিবসা নদীর পূর্বপাড়ে শেখেরটেক, আদাচাই টহল ফাঁড়ি ছাড়িয়ে গেছে এই ভাঙন। ভাঙনে নদীপাড়ে বড় বড় গেওয়া ও সুন্দরী গাছ মাটিসহ নদীতে দেবে যাচ্ছে। পরে জোয়ারের পানিতে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে গাছ।

কয়েকটি স্থানে দেখা গেছে, জোয়ারের সময় গাছের গোড়া থেকে মাটি ধুয়ে যাচ্ছে। এতে গাছের শেকড় আলগা হয়ে যাচ্ছে। সহজেই গাছগুলো উপড়ে পড়ছে। পরবর্তীতে গাছ মারা যাচ্ছে। ভাঙনের কারণে বনের ভেতরে ছোট খাল এবং বড় নদীর দুই পাশে নতুন চর জাগছে। কিন্তু সেখানে ঘাসের আধিক্য বেশি। এসব স্থানে গাছ জন্মানো এবং বড় হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, নদীভাঙনে বড় গাছ কমলেও বড় গাছ তৈরি  হচ্ছে না।

৯ অক্টোবর থেকে মৎস্য আহরণ বন্ধ হয়ে  যাওয়ায় সুন্দরবনে এখন জেলেদের উপস্থিতি বেশি। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিবসা নদীর পাড়ে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বন ভাঙছে। অতীতের চেয়ে এই ভাঙনের মাত্রা বেশি। গত দেড়-দুই বছরে নদী ভেঙে বনের ১৫-২০ ফুট ভেতরে ঢুকে গেছে। পশ্চিম সুন্দরবনের নিচেও মরজাট নদীতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন নিয়ে গবেষণা করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। সমকালকে তিনি বলেন, সুন্দরবনের পশ্চিমে অর্থাৎ নলিয়ান, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। লবণাক্ততা বাড়লে মাটির বন্ডিং কমে যায়। তখন জোয়ারের সময় সহজেই ভাঙন ধরে।

তিনি আরও জানান, উপকূলে বাঁধ দেওয়ায় নদীভাঙনের মাটি অন্য কোথায় যেতে পারছে না। মাটি বা পলি নদীর ভেতরেই থাকছে। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হচ্ছে এবং পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে জোয়ারের সময় পানি সুন্দরবনের আরও বেশি ভেতরে প্রবেশ করছে। দীর্ঘ সময় সুন্দরবনের ভেতরে পানি থাকায় ভাঙন আরও বাড়ছে।

নলিয়ান ও শিবসা নদী এলাকা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশির আল মামুন সমকালকে বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে এক পাশে নদী ভাঙবে, আবার অন্য পাশ গড়ে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক। বনের ভেতরে ভাঙন রক্ষার কোনো পরিকল্পনা কখনও করা হয়নি।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে ভাঙন নিয়ে কোনো জরিপ হয়নি। এজন্য এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। তবে একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে স্থলভূমি ১ শতাংশ বেড়েছে।