শুক্রবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা…

news-image

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ৩০ বছর আগে ইব্রাহীম-শামছুন্নাহার দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে কন্যা সন্তান মিনারা পারভীন। প্রথম সন্তান তাই পরিবারে আনন্দটাও একটু বেশি। মিনারার বয়স যখন ৭-৮ মাস তখন তার হাত-পা চিকন হয়ে যেতে থাকে। হাতে-পায়ে বল কমতে শুরু করে। দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় পরিবার। ছুটতে থাকে ডাক্তার-কবিরাজের কাছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই ভালো হয়নি মিনারা পারভীনের অবস্থা।

১০ বছর পর জন্ম নেয় বিউটি (২০) এরপর তাপসী (১৫) তারপর শাবনুর (১১)। কিন্তু সবার ভাগ্যে একই পরিণতি। তারা চারজনই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের হাত-পা চিকন হয়ে অবশ হয়ে গেছে। অন্যের সাহায্য ছাড়া তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নড়াচড়া পর্যন্ত করতে পারে না।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাধাকানাই গ্রামের চৌরঙ্গী পাড়ার দিনমজুর ইব্রাহীমের হতভাগ্য চার কন্যা মিনারা পারভীন, বিউটি, তাপসী ও শাবনুর। বাড়ির বারান্দাতেই কাটে তাদের সারাদিন।

ইব্রাহীমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ছোট একটি বাড়ির বারান্দায় প্রতিবন্ধী চার বোন বসে আছে। ওই বারান্দায়ই তাদের সারাদিন কাটে। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সব কাজ করতে হয় বাবা-মায়ের সাহায্য নিয়ে। বড় বোন মিনারা কথা বলতে পারলেও ছোট তিন বোন ঠিকমত কথা বলতে পারে না। কারো সাহায্য ছাড়া তারা নড়াচড়া করতে পারে না। মিনারার সঙ্গে কেউ কথা বললে বাকি তিন বোন শুধু ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকে। ইব্রাহীমের পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার বড় মিনারা।

Mymensingh-Pic02.jpg

বড় মেয়ে মিনারা পারভীন বলেন, আমরা চার বোন এক সঙ্গে বারান্দায় বসে থাকি। কারও সাহায্য ছাড়া আমরা নড়াচড়া করতে পারি না। আব্বা-আম্মা এত দিন ধরে সব কিছু করেছেন। এখন তাদেরও বয়স হয়েছে। আগের মত শক্তিও নেই তাদের শরীরে। আব্বা-আম্মা মারা গেলে আমাদের কী হবে, কে দেখে রাখবে আমাদের। এই বলে কেঁদে ফেলেন মিনারা। তার চোখে পানি দেখে বাকি তিন বোনও চোখ মুছতে থাকে।

প্রতিবন্ধী বিউটি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, জ্ঞান অইবার (হওয়ার) পর থাইক্কা (থেকে) বড় বইনের লগে জায়গা হইছে বারিন্দায়। আমরার লগে একই ভাগ্য লইয়া যোগ হইছে আরও দুই বইন (বোন)। বইয়া (বসে) থাকতে থাকতে দিনরে মনে হয় কত লম্বা। চিন্তা করি কখন রাতই অইব। রাইত হলে ভাবি সকাল কহন অইব। আমরা এই সমাজের সবচেয়ে দুঃখী মানুষ। খাইয়া না খাইয়া কোনো রকম বাইচ্চা (বেঁচে) আছি। একজনের সাহায্য ছাড়া চলতারি না, বাইরে ঘরে যাইতারি না। বইয়া বইয়া ভাবি বাপ-মা মইরা গেলে আমরারে কে দেখবো।

মা শামছুন্নাহার বলেন, ভিটেমাটি বলতে ৮ শতাংশ জমিই শেষ সম্বল। পাঁচ মেয়ের মধ্যে চারজনই প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় মেয়ে ফরিদা ইয়াসমীন সুস্থ স্বাভাবিক। তার বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সংসারেই থাকে। চার প্রতিবন্ধী মেয়ে রেখে কোথাও কাজ করার জন্য যেতে পারি না। স্বামীর উপার্জন ও সরকারি ভাতার টাকায় জীবন চলে খেয়ে না খেয়ে।

দিনমজুর ইব্রাহীম বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ আমি। স্ত্রীও এক রকম মানসিক প্রতিবন্ধী। সংসারের সব কাজ আমাকেই করতে হয়। বাড়িতে একটি টিউবওয়েল নেই। পানি আনতে হয় দূর থেকে। ঠিকমত ওদের দেখাশুনা করতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, চোখের সামনে মেয়েদের এমন কষ্ট দেখে মইরা যাইতে মন চায় । কাজ করি আর ভাবি আমি যদি মরে যাই তাহলে ওদের কে দেখবে? সরকার যদি আমার এই চার দুঃখী মেয়ের জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিত তাহলে মরেও শান্তি পেতাম।

প্রতিবেশী আইয়ুব আলী বলেন, জন্মের সময় সবাই সুস্থ ও ভালো ছিল। যখন ওদের বসার মতো বয়স তখন থেকেই হাত-পা চিকন হয়ে অবশ হয়ে যায়। ইব্রাহীমের পাঁচ মেয়ের মধ্যে চার মেয়েই প্রতিবন্ধী। দেখলে আমাদেরও মায়া লাগে। আমরাও গরিব তাদেরকে কোনো সহযোগিতা করতে পারি না।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আশরাফ সিদ্দিক বলেন, ইব্রাহীমের চার মেয়েই প্রতিবন্ধী। বিষয়টি অত্যন্ত কষ্টের। বর্তমানে তিনটি প্রতিবন্ধী কার্ডের সুবিধা পায় পরিবারটি। খোঁজখবর নিয়ে তাদেরকে আরও কীভাবে সহযোগিতা করা যায় আমি সেই চেষ্টা করব। জাগো নিউজ