মঙ্গলবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং ১০ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস শিশুর জন্য ঝুঁকি

আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া
জানুয়ারি ১২, ২০১৮
news-image

স্বাস্থ্য ডেস্ক : বর্তমানে পৃথিবীতে মোট ডায়াবেটিক রোগীর কমপক্ষে ১৬.২ শতাংশ শুধু গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এ হার মোট ডায়াবেটিক রোগীর ২৩.৬ শতাংশ। বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশিও হতে পারে। প্রায় ১৯৯ মিলিয়ন নারী ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। যা ২০৪০ সালে ৩১৩ মিলিয়নে উন্নীত হবে।

অন্য দিকে প্রতি ৫ জন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলা প্রজনন সময়কালের মধ্যে আছেন। যা প্রায় ৬০ মিলিয়ন। প্রতিবছর ২.১ মিলিয়ন (২১ লাখ) মহিলা শুধু ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যু বরণ করেন। যেসব মহিলার ডায়াবেটিস আছে তাদের হার্ট অ্যাটাক ও এ ধরনের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি, যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। আর যাদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস আছে তাদের গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। প্রতি ৭টি প্রসবের মধ্যে ১টি মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দ্বারা আক্রান্ত। এর অর্ধেকেরই বেশি ৩০ বছরের কম বয়সী প্রসূতিদের ক্ষেত্রে ঘটে। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে এদের অর্ধেকেরও বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হবেন, অধিকাংশ গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলার বসবাস অনুন্নত দেশগুলোতে।

অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে তো বটেই উন্নত দেশেও গর্ভবতীর ডায়াবেটিস তার নিজের ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য ব্যাপক ঝুঁকির কারণ। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম বাধা হল জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও এর কারণে বর্ধিত মাতৃমৃত্যু। তাই IDF যতটুকু উদ্যোগ নিয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ উদ্যোগ বাংলাদেশে অতি জরুরিভিত্তিতে নেয়া উচিত।

IDF-এর নির্দেশনা

* রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনার সর্বস্তরে নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

* ডায়াবেটিস আক্রান্ত মহিলাদেরও পর্যাপ্ত অত্যাবশকীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে চিকিৎসা উপাদান (ওষুধপত্র, যন্ত্রপাতি) ডায়াবেটিস চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ফলো-আপ ব্যবস্থাপনা।

* যারা ডায়াবেটিস নিয়ে সন্তান ধারণ করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সব পক্ষীয় (সন্তান প্রসব আকাঙ্ক্ষিত নারী, সেবাদানকারী সংস্থা সমূহ এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা কাঠামো) উদ্যোগ নিতে হবে যাতে গর্ভধারণের আগে থেকেই গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন সময়ের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

* সব বালিকা ও নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় শারীরিক শ্রম সম্পাদনের উৎসাহ দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

* ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নীতিমালা ও পরিকল্পনায় নারীদের সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং প্রাক-গর্ভকালীন ও গর্ভকালীন এবং নবজাতকের ও শৈশবকালীন পুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে।

* গর্ভকালীন সেবা আদর্শ মাত্রায় উন্নীত করার জরুরি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বিশেষ করে এতে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার তাগিদ থাকতে হবে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় মহিলা ও প্রসূতি সেবাদানকারী সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রেরণের শিক্ষা দিতে হবে।

* সব নারীর গর্ভকালীন দ্রুত ডায়াবেটিস স্কিনিং, ডায়াবেটিস সংক্রান্ত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্বসহকারে নিশ্চিত করতে হবে।

* মহিলা ও বালিকারাই আগামী দিনের সুস্বাস্থ্যময় জনগোষ্ঠী তৈরির প্রধানতম ফ্যাক্টর। যেহেতু প্রায় ৭০ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস যথাপোযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব। প্রাপ্তবয়স্কদের ৭০ শতাংশ মৃত্যু বয়ঃসন্ধিকালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জীবনযাপন সংক্রান্ত জটিলতা দ্বারা সৃষ্ট এবং নারী, মা হিসেবে এসব রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তার ব্যাপক প্রভাব থাকবে। গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, মা সম্পদের ওপরে, খাদ্যের ওপরে, শিশু বিকাশে পুষ্টির ওপরে এবং তাদের শিক্ষার ওপরে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। অন্যভাবে বলা যায়, পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি ও জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণের প্রধান ব্যক্তি হলেন মা। সে জন্য তার (বালিকার, নারীর) সঠিক শিক্ষা ও সম্পদের সব ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় অধিকারে মা-এর কর্তৃত্ব স্থাপনের যথাযথ সুযোগ থাকতে হবে। বালিকা ও নারীর সুস্বাস্থ্য, স্বাভাবিক নিরোগ শারীরিক কাঠামো তৈরিতে উদ্যোগী হতে হবে।

‘নারী ও ডায়াবেটিস, স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ আমাদের অধিকার’ এটি শুধু ডায়াবেটিসবিষয়ক কোনো চিন্তা-ভাবনা নয়, বরং সামগ্রিক সু-স্বাস্থ্যর অধিকারী জনগোষ্ঠী তৈরিতে প্রাথমিক, ব্যাপক বিস্তারি এবং অনায়াসে পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব এমন একটি দিক নির্দেশনা।

International Diabetes Fedaration (IDF) গর্ভকালীন ডায়াবেটিসকে অন্য অসংক্রামক রোগগুলোর কাতারে ফেলতে নারাজ। কেননা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভবতীকে আক্রান্ত করছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে গর্ভস্থ শিশুর, অর্থাৎ সরাসরি রোগটি সংক্রামক না হলেও এর সদূর প্রসারিত ক্ষতিকর প্রভাব আক্রান্ত করছে পরবর্তী প্রজন্মকে। শুধু তাই নয় এ শিশুটির ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস (টাইপ-২) হওয়ার আশংকা তার সমসাময়িকদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এটাকে মনে রেখেই স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, নবজাতক ও শিশু-রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ব্যাপক উদ্যোগ কাম্য। এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসকে সামনে রেখে হলেও প্রচারে মাধ্যমগুলো (টিভি চ্যানেল, পত্রিকা) ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে পারে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ডায়াবেটিস গর্ভধারণ প্রক্রিয়া, গর্ভকালীন পরিচর্যা, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় বোধগম্যভাবে উপস্থাপনা করতে পারলে দীর্ঘস্থায়ী ফল পাওয়া যাবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়